কোণঠাসা জঙ্গিরা একজোট হচ্ছে!

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০১৮, ০৮:৪৯ | আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৮, ০৯:২০

জুবায়ের চৌধুরী

গুলশান হামলার পর প্রকাশ্যে আসে আইএসপন্থি জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি। এর আগে সবচেয়ে বেশি টার্গেট কিলিং ঘটিয়েছে আল কায়েদাপন্থি আনসার আল ইসলাম। এ দুটি সংগঠনই দেশে টার্গেট কিলিংয়ে যুক্ত। তবে জেএমবির পুরনো অংশটিও ভিন্ন মতাবলম্বীদের টার্গেট করে হত্যা করেছে। গত এক যুগে জেএমবি কিংবা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ (এবিটি) বেশ কয়েকটি নিষিদ্ধ সংগঠন ভেঙে ভিন্ন ভিন্ন নামে তাদের উগ্রপন্থি মতবাদ নিয়ে প্রকাশ্যে এসেছে। ২০১৩ সালে সব নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনকে এক ছাতার নিচে আনার পরিকল্পনা নিয়ে তৎপর ছিলেন নব্য জেএমবির প্রধান তামিম আহমেদ চৌধুরী। কিন্তু তার সেই প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো। এর পরও তারা তাদের মতভেদ ভুলে একজোট হওয়ার চেষ্টা করছে।

এদিকে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় আন্তর্জাতিক দুটি জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও আল কায়েদার অনুসারীরা এখন বাংলাদেশে ব্যাপক সক্রিয়। আর আইএস অনুসারী হচ্ছে নব্য জেএমবি এবং আল কায়েদার অনুসারী হচ্ছে আনসার আল ইসলাম। দেশে এ দুটি জঙ্গি সংগঠন এখন সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। আবার পুরনো জেএমবিও গোপনে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ মুন্সীগঞ্জে ব্লগার ও প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চু হত্যার ঘটনায় পুরনো জেএমবির সঙ্গে অন্যরাও জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব তথ্যের কারণে সতর্ক নজরদারি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, সিরিয়া এবং তার আশপাশে যুদ্ধরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে। বেশ কয়েকটি ঘটনায় জঙ্গিরা এক ছাতার নিচে আসার প্রমাণ মিলেছে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনা ঘটে। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ওই হামলার পর দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং জঙ্গিদের সক্ষমতা প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে সরকার। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপে অল্প সময়েই ঘুরে দাঁড়ায় দেশ। একের পর এক অভিযান চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় জঙ্গিদের আস্তানা। গুলশান হামলার কুশীলবসহ শীর্ষ জঙ্গিরা অভিযানে নিহত হয়। গ্রেফতার হয়েছে অনেকে। গত দুই বছরে শতাধিক অভিযানের মধ্যে ৩০টি বড় আস্তানায় হানা দেয় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এবং র‌্যাব। এসব অভিযানে ৯২ জন নিহত হয়েছে।

র‌্যাব ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অভিযানে ভেস্তে যায় জঙ্গিদের নাশকতার পরিকল্পনা। বারবার ভেঙেছে তাদের নেতৃত্ব কাঠামো। আতঙ্ক কেটে বাংলাদেশে ভ্রমণ ও বিনিয়োগে আবারও আস্থা ফিরে পেয়েছে বিদেশিরা। কড়া নজরদারির কারণে গত দুই বছরে বড় হামলা বা নাশকতার ঘটনা ঘটেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিরা আবারও সংগঠিত হতে চাইছে বলে তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। পুরনো জেএমবি, নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের পলাতক জঙ্গিরা একই প্লাটফর্মে এসে টার্গেট কিলিংয়ের পরিকল্পনা করছে। এর আগে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সারা দেশে একের পর এক ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, মুক্তমনা, বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু, সমকামী এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের টার্গেট করে হত্যা করা হয়। ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, মুক্তমনা এবং সমকামীদের হত্যার পেছনে ছিল আনসার আল ইসলাম। অন্যদিকে বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের টার্গেট করে হত্যার নেপথ্যে ছিল জেএমবি ও নব্য জেএমবি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে টার্গেট কিলিংয়ের ছক কষছে জঙ্গিরা। তাদের হিটলিস্টে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়, প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ নেতারা রয়েছেন। জঙ্গি টার্গেটে রয়েছেন প্রগতিশীল লেখক, চিন্তাবিদ, ব্লগার, সংখ্যালঘু, পুলিশ প্রশাসনের কর্তারা। জঙ্গিরা গোপনে নতুন সদস্য সংগ্রহ, তহবিল সংগ্রহ, প্রচারণা ও টার্গেট নির্ধারণের কাজ করছে বলেও তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। গত ১১ জুন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে প্রকাশক ও সাবেক সিপিবি নেতা শাহজাহান বাচ্চু হত্যা এবং কয়েকটি ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় মিলেছে এসব আলামত। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গত মে মাসের শুরুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো চিঠিতে জঙ্গি হামলার আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

তবে পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, গুলশান হামলা জঙ্গিবিরোধী আন্দোলন ও সফলতার একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এরপর জঙ্গি দমন করে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। সরকার এই জঙ্গিবিরোধী কর্মকান্ডে জনগণকেও সম্পৃক্ত করেছে। দেশে জঙ্গিরা একেবারেই কোণঠাসা। এমন সাফল্য নষ্ট হতে দেবেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ফলে গোয়েন্দা তথ্যের পর নজরদারিও জোরদার হয়েছে। সম্প্রতি কাউন্টার টেররিজম ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, এ মুহূর্তে জঙ্গিদের নিয়ে সুনির্দিষ্ট বা বড় কোনো হুমকিতে নেই দেশ। তবে কোনো আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জঙ্গিরা সব সময়ই পুনঃসংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। তবে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

নির্বাচন ঘিরে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নাশকতার পরিকল্পনা করছে জঙ্গিরা। বিগত দুই বছর জঙ্গি তৎপরতা যে হারে মাথাচাড়া দিয়েছিল চলতি বছর তা অনেকটাই কমে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় জঙ্গিদের নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার নমুনা মিলেছে। তাই জঙ্গি ইস্যু নিয়ে আবারও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব কারণে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

জানা গেছে, পলাতক ও নতুন সংগঠিত জঙ্গিদের বিষয়ে নতুন করে সতর্ক নজরদারি শুরু করেছে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে পুরনো জেএমবি, নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের জঙ্গিদের নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার নমুনা পেয়েছে গোয়েন্দারা। বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত নাশকতার পরিকল্পনা করছে জঙ্গিরা। এজন্য গোপনে নতুন সদস্য সংগ্রহ, তহবিল সংগ্রহ, প্রচারণা ও টার্গেট নির্ধারণের কাজ করছে তারা। বগুড়া, নারায়ণগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ঢাকায় গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের কাছ থেকে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার তথ্য মিলেছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত ১১ জুন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক ও সাবেক সিপিবি নেতা শাহজাহান বাচ্চু হত্যাকান্ডে দুই মোটরসাইকেলে এসে চারজন কিলিং মিশনে অংশ নেয়। এ হত্যাকান্ডের আলামত এবং আগে হুমকির কারণে ঘটনাটি আনসার আল ইসলামসহ জোটবদ্ধ জঙ্গিরা ঘটিয়েছে বলেই ধারণা তদন্তকারীদের। অন্যদিকে জঙ্গিরা তাদের তহবিল সংগ্রহে ডাকাতি-ছিনতাই করছে। সম্প্রতি ঢাকা, রাজশাহী ও গাজীপুরে অন্তত ১৫টি ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনায় জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

অপরদিকে বগুড়া থেকে উদ্ধার হওয়া এক জঙ্গির দুটি চিঠিতে নির্বাচনের আগে নাশকতার পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য মিলেছে। গত ১৯ মার্চ বগুড়ায় তিন জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। এদের একজন হলো আবির। আবিরের কাছে শীর্ষস্থানীয় জঙ্গি নেতাদের উদ্দেশে অন্য এক জঙ্গির লেখা পাঁচ পৃষ্ঠার দুটি চিঠি পাওয়া যায়। চিঠি দুটি জেএমবির আমির সালাউদ্দিন ওরফে সালেহীন ওরফে দাদা ভাইয়ের উদ্দেশে লেখা। চিঠিটি পৌঁছানোর আগেই তা গোয়েন্দাদের হাতে এসে পড়ে। ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশ খুন করে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া সালেহীন বর্তমানে ভারতে থেকে পুরনো জেএমবির নেতৃত্ব দিচ্ছে। পালিয়ে থাকা আরেক জঙ্গি জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান জামাতুল মুজাহিদিন ইন্ডিয়া (জেএমআই) নামে সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

দুটি চিঠি কারাগারে বসে লিখেছে সজল (ছদ্মনাম) নামের এক জঙ্গি। চিঠিতে সজল লিখেছে, ‘অ্যামুনেশন সংগ্রহে তৎপর হওয়া দরকার। সামনে নির্বাচন। বিভিন্ন রকম সহিংসতা হবে। এই সুযোগ কাজে লাগানো দরকার।’ চিঠিতে গত ১৩ নভেম্বর ছয়জনের নামে ১৫ হাজার, ১৫ ডিসেম্বর তিনজনের নামে ১৫ হাজার, ৮ জানুয়ারি তিনজনের নামে ১৫ হাজার টাকা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে জঙ্গিদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।

পিডিএসও/হেলাল