আবারও কি সহিংস হয়ে উঠছে পাহাড়!

জেএসএস ও ইউপিডিএফ এক হওয়ায় বেড়েছে অস্ত্রের ঝনঝনানি

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৮, ১০:১১ | আপডেট : ১৭ মে ২০১৮, ১২:০৬

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

পাহাড় কি আবারও আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছে? আবারও কি অশান্ত হয়ে উঠছে পাহাড়, আবারও কি সেখানে হত্যা, অপহরণ আর খুনোখুনি শুরু হচ্ছে? এমন প্রশ্ন এখন বিভিন্ন মহলের। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা অনেকের মধ্যে। কারণ, পাহাড়ে দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক নতুন মেরুকরণ। মূল দুই সংগঠন জেএসএস ও ইউপিডিএফ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বিবদমান সংগঠন দুটির একত্রীকরণে প্রাণ পেয়েছে অস্ত্রের শক্তি। আর এ দুটি সংগঠন থেকে যারা বের হয়ে নতুন দল গঠন করেছেন, তাদের ওপর নেমে এসেছে মৃত্যু ও খড়গ। এরই মধ্যে নতুন দলের দু’প্রধান নেতাসহ পাঁচজনকে হত্যা করা হয়েছে। পাহাড়ে আবারও রক্ত ঝরা শুরু হয়েছে। সরকার কঠোর না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পাহাড়ে শিগগিরই সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতির কথা শোনা যাচ্ছে। গত কয়েক দিনে পাহাড়ে খুনোখুনির ঘটনায় বিব্রত প্রশাসন। বড় ধরনের সহিংসতা এড়াতে সব মহলকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। শান্তি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন রোধ করতে এসব সহিংসতা সংঘটিত হচ্ছে বলে সরকারি মহলের ধারণা। এরই মধ্যে সরকারের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এসব ঘটনার পেছনে বিএনপি-জামায়াতের হাত রয়েছে। এরই মধ্যে বান্দরবানে পাহাড়ি কারবারিসহ কয়েকজন অপহৃত হয়েছে। তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় আরাকান আর্মিকে দায়ী করা হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ে পুরনো জেএসএস ও ইউপিডিএফ’র অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এদের অনেকে বিভিন্ন পদে রয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের অনেক চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও হামলার আশঙ্কায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে।

শান্তি চুক্তির ২০ বছর পার হয়ে গেছে কিন্তু পাহাড়ে শান্তি আসেনি। এখনো পাহাড়িদের প্রতিটি রাত কাটে আতঙ্ক আর নির্ঘুম। পাহাড়ি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোতে আবারও অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়েছে। ব্রাশ ফায়ারে লাশ হচ্ছে মানুষ। আতঙ্কে কমে গেছে পর্যটক। গত দেড় দশকে পাহাড়ি সন্ত্রাসবাদীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে হাজারো মানুষ। অপহরণের শিকার হয়েছেন আট শতাধিক। পাহাড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ডজনখানেক সন্ত্রাসবাদী সংঘটন। নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং, দল-উপদল সৃষ্টি করে পাহাড়ি মানুষদের জিম্মি করে রেখেছেন তারা। পুরনো অস্ত্রের পরিবর্তে এখন নিত্যনতুন অস্ত্রের মহড়াও চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে পাহাড়ে খুন-সন্ত্রাস লেগে ছিল। বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ে শান্তি বাহিনীর সন্ত্রাস ছিল নজরে পড়ার মতো। রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া ছিল অস্ত্রের ভাষায়। পার্বত্য জনসংহতি সমিতির ব্যানারে পাহাড় ছিল সন্তু লারমার নিয়ন্ত্রণে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাহাড়ে শান্তি ফেরানোর কাজ শুরু হয়। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য জনসংহতি সমিতির শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হয়। শান্তিচুক্তির বিষয়টি পাহাড়ের অনেকে মেনে না নিলেও জনসংহতি সমিতি ও সরকারের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় পাহাড়ে খুনাখুনি কিছুটা বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু বছর যেতে না যেতেই পাহাড়ে অশান্তি পুনরায় শুরু হয়। শান্তি চুক্তি মেনে না নেওয়া অংশটি ১৯৯৮ সালে গঠন করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এরপর ইউপিডিএফ’র সঙ্গে জনসংহতি সমিতির প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এক গ্রুপের হাতে অন্য গ্রুপের সদস্যরা প্রাণ হারাতে থাকে। পার্বত্য শান্তিচুক্তি পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হচ্ছে না বা শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না—এ স্লোগানে ইউপিডিএফ নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। বিভিন্ন স্থানে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। আর জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) ভেতরেও ক্রমশ কোন্দল বাড়তে থাকে। একটি অংশ সরকারের সঙ্গে থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করলেও জেএসএস’র ভেতরে অন্য একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। যার ফলে ২০১০ সালে জেএসএস ভেঙে যায়। গঠন হয় জেএসএস (এমএনলারমা)। এর নেতৃত্বে ছিলেন সম্প্রতি খুন হওয়া শক্তিমান চাকমা। শুধু জেএসএস ভাঙেনি, ভেঙেছে ইউপিডিএফও। পুরনো ইউপিডিএফ’র নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রসিত খীসা চাকমা, আর নতুন ইউপিডিএফ’র নেতৃত্বে ছিলেন তপন জ্যোতি চাকমা। নতুন ইউপিডিএফ গঠনের পর থেকে এ সংগঠনের নেতাদের অনেক নেতাকে একে একে হত্যা করা হয়। তাদের সর্বশেষ শিকার সংগঠনের খোদ আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমা। এর আগে দুজন রাঙ্গামাটিতে এবং একজন খাগড়াছড়িতে প্রাণ হারায়। এদের মধ্যে মিঠুন চাকমা ছিলেন নতুন ইউপিডিএফ’র থিংক ট্যাংকখ্যাত মেধাবী যুবক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০১৭ সালের দিকে জেএসএস’র একটি অংশ সন্তু লারমার নেতৃত্ব থেকে বের হয়ে প্রশাসনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনায় সচেষ্ট ছিল। একইভাবে ইউপিডিএফ’র একটি অংশ মূল সংগঠন থেকে বের হয়ে তারাও প্রশাসনের সঙ্গে ভাব রেখে চলছিল। যা থেকে বের হয়ে শক্তিমান চাকমা নতুন জেএসএস’র প্রধান হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যান হন। তাকে সহযোগিতা করেন নতুন সংগঠন ইউপিডিএফ’র প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা। তাদের এ তৎপরতায় সরকারের সঙ্গে পুরনো জেএসএস’র দূরত্ব সৃষ্টি হয়। ফলে পুরনো জেএসএস নেতা সন্তু লারমার ক্ষমতা খর্ব হতে থাকে। জেএসএস’র একটি অংশের অভিযোগ, সরকারের সঙ্গে থেকে চুক্তি বাস্তবায়নের নামে একটি অংশ নিজেরা লাভবান হচ্ছে। এর ফলে জেএসএস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মূলত আধিপত্য বিস্তার, সরকারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি, আশানুরূপ সরকারি সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে পাহাড়ে আবারও বিভিন্ন গ্রুপ অস্ত্র তুলে নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আপাত দৃষ্টিতে পাহাড়ে সন্ত্রাস সৃষ্টির পেছনে চারটি সন্ত্রাসী গ্রুপকে দায়ী করা হলেও ভেতরে আরও অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রুপ আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের প্রায় ৮৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোনো সীমান্ত চৌকি নেই। ফলে পাহাড়ে অবাধে অস্ত্র ঢুকছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাহাড়ের সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোর কাছে তিন হাজারেরও বেশি অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে ব্যবহৃত অস্ত্রেও মান পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞদের কাছে এ তথ্য উঠে এসেছে। তাছাড়া বিভিন্ন সময় অভিযানে উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে মিয়ানমারে তৈরি একে-৪৭ রাইফেল, একে-২২ রাইফেল, এম-১ রাইফেল, লাইট মেশিনগানসহ নানা অস্ত্র রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, পার্বত্য এলাকায় শুধু পাহাড়ি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন নয়, মিয়ানমারের কিছু সন্ত্রাসবাদী সংগঠনও এদের অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করছে। মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (এআরএসও), ন্যাশনাল ইউনাইটেড পার্টি অব আরাকান, ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আরাকান (ডিপিএ), আরাকান আর্মি (এএ), আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (এআরএনও), ন্যাশনাল লিবারেশন পার্টি (এনএলএফটি) ও এনএসসিএন নামের সংগঠনের অস্তিত্ব দেশের গোয়েন্দা সংস্থার হাতে রয়েছে। এসব সংগঠন পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ইন্ধন দিচ্ছে কিনা, এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একইসঙ্গে ত্রিপুরা ও আসামভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন অল ত্রিপুরা লিবারেশন ফ্রন্টের নামও শোনা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের মূল আয় চাঁদাবাজি আর অপহরণ বাণিজ্যে। পাহাড়ে যেসব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মাসে মাসে চাঁদা আদায় করে সন্ত্রাসীরা। পার্বত্য এলাকার গভীরে থাকা অনেক সংগঠন অস্ত্র ও ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ আছে। পাহাড় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকুক এসব সন্ত্রাসবাদী সংগঠন চায় না।

১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির ৭৭টি শর্তের মধ্যে ৫৫টি শর্ত বিভিন্নভাবে মানা হয়েছে। নানা কারণে বাকি শর্তগুলো মানার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা লেগে আছে। এ সুযোগে পাহাড়ে নানা অশান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। অনেকের মতে, আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পাহাড় যদি অশান্ত হয়, তাহলে প্রশাসনের নজর এদিকে পড়ে থাকবে। ফলে অস্থিরতা বাড়বে। তবে আশার কথা, পাহাড়ে সাম্প্রতিক অশান্তির ছোবল যাতে আর বাড়তে না পারে তার জন্য প্রশাসনের নজরদারি শুরু হয়েছে। পাহাড়ি মানুষও আর সন্ত্রাস দেখতে চায় না। গত ছয় মাসে পাহাড়ে ২২ জনকে হত্যা করা হয়েছে। মূলত সংগঠনগুলোর নেতৃত্বের বেশিরভাগই শিক্ষিত। সাম্প্রতিক ঘটনা ঘটার আগে পাহাড়ি হিল উইমেন ফেডারেশনের দুজন নেত্রীকে অপহরণ করা হয়েছিল। এই দুই নেত্রী ইউপিডিএফ প্রসিত খিসার দলের। এ ঘটনার জন্য হত্যাকান্ডে নিহত শক্তিমান চাকমাকে দায়ী করা হলেও তিনি সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার অস্বীকারের কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে হত্যা করা হয়। জন্ম থেকে চিরশত্রু পুরনো ইউপিডিএফ ও জেএসএস এখন বন্ধু। অপরদিকে এ দু’সংগঠন থেকে বের হয়ে নতুন সংগঠন যারা করেছেন, তাদের উভয়ের মধ্যে রয়েছে সখ্য। আর দু’সংগঠনের সখ্যকে মেনে নিতে পারেনি পুরনোরা। ফলে দু’সংগঠনের মূল নেতৃত্বে থাকা দু’নেতা জেএসএস (এমএনলারমা)-এর শক্তিমান চাকমা ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নেতা তপন জ্যোতি চাকমাকে হত্যা করা হয়।

পিডিএসও/হেলাল