মরণ নেশায় ডুবছে সমাজ

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৮, ১০:৪৫ | আপডেট : ১৪ মে ২০১৮, ১২:৫৩

জুবায়ের চৌধুরী

মাদকের ভয়াবহ ছোবলে বাংলাদেশ। নীরবে চলছে এ মরণ খেলা। এর শিকার দেশের তরুণ প্রজন্ম। তারাই এ মাদক আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় শিকার। মাদকের ভয়াবহ ছোবলে আক্রান্ত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। কারণ, ক্যাম্পাসে বসে তারা খুব সহজেই মাদক হাতে পাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, অনলাইনে অর্ডার করলে ঘরে বসেই পাওয়া যাচ্ছে যেকোনো ধরনের মাদক। তবে দেশে এখন ইয়াবা ট্যাবলেটের সরবরাহ বেড়ে গেছে মাত্রাতিরিক্তভাবে। এতে ডুবছে সমাজ।

প্রতিটি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যেন মাদকের রমরমা হাট। এ দেশের তরুণ মেধাবীরা যেখানে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে। শিক্ষাজীবন শেষ করে স্বপ্নের দেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে সেখানে তারা প্রবেশ করছে স্বপ্নহীন এক অন্ধকারে জগতে। যে জীবন ধুঁকে ধুঁকে শেষ করে দিচ্ছে জাতির মেরুদণ্ড। মাদকাসক্ত স্বামীর হাতে স্ত্রী, ভাইয়ের হাতে ভাই, ছাত্রের হাতে শিক্ষক খুন হচ্ছেন। মাদকের কারণে তছনছ হচ্ছে পরিবার, প্রতিদিনই ভাঙছে কোনো না কোনো সংসার। বাড়ছে পারিবারিক দ্বন্দ্ব-বিভেদ, অস্থিরতা। এমনকি মাদকের টাকা সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে আদরের সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়ার মতো মর্মস্পর্শী ঘটনাও ঘটেছে। সবকিছু ছাপিয়ে সর্বনাশা মাদক ধ্বংস করছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।

পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, দেশের ২০ থেকে ৪০ বছরের প্রায় ৯ কোটি মানুষ আজ মাদকের চরম ঝুঁকিতে। এত তরুণ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও নেই। দেশে বর্তমানে মাদকাসক্ত প্রায় ৭০ লাখ। এর মধ্যে ৬৫ ভাগ তরুণ। আর মাদকসেবীদের ৮০ শতাংশই এখন মরণ নেশা ইয়াবায় আসক্ত। মাদক নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। তবে মাদকের ভয়াবহতা এসব পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি ভয়ংকর। বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা চোখে যা দেখা যাচ্ছে বাস্তবে মাদকাসক্তের সংখ্যা এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।

মাদকের ছোবলে আক্রান্ত নারীরাও। পারিবারিক কলহ থেকে নারীরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। প্রথমে সিগারেট দিয়ে শুরু। একপর্যায়ে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ছেন অনেকে। নারী মাদকাসক্তদের অনেকেই বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে কৌতূহলবশত ঝুঁকে পড়েন। একপর্যায়ে পেশাদার মাদকসেবী। বাংলাদেশের মাদকবিরোধী সংস্থা মানস বলছে, দেশে প্রায় ৭০ লাখ মাদকাসক্ত ব্যক্তির ১৬ শতাংশই নারী। ঢাকায় আহছানিয়া মিশনে মেয়েদের জন্য একটি আলাদা মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৫ শতাংশ নারী নানা ধরনের মাদকে আসক্ত বলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। আর এদের ৪৩ শতাংশ নারী সেবন করছেন ইয়াবা। গবেষকরা বলছেন, দিন দিন এ নির্দিষ্ট মাদকটির সহজলভ্যতার কারণেই এর দিকে ঝুঁকে পড়ছেন নারীরা।

জানা গেছে, স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়েদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার একটা প্রধান কারণ পরিবার বা বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক না থাকা বা বাবা-মায়ের কাছ থেকে তাদের প্রত্যাশামতো সময় না পাওয়া। আবার দাম্পত্য কলহের কারণে অনেক গৃহিণী মাদকাসক্ত হচ্ছেন। মানস বলছে, পাঁচ বছর আগে নারীদের মধ্যে মাদক নেওয়ার প্রবণতা ছিল ৫ শতাংশ। তবে পুরুষদের যতটা সহজে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব বা নিরাময় কেন্দ্রে আনা যায়, মেয়েদের ক্ষেত্রে বিষয়টা বেশ জটিল।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দফতর ইউএনওডিসির তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মাদক সেবনকারী ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ সংক্রামক রোগ হেপাটাইটিস সির চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ২০১৫ সালে বিশ্বে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ বৈধ ও অবৈধভাবে মাদক সেবন করেছেন এবং এদের মধ্যে দুই কোটি ৯৫ লাখ মাদকজনিত সমস্যায় ভুগছে।

এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত ৫ বছরে নেশায় সন্তানদের হাতে কমপক্ষে ৩৮৭ জন বাবা-মা নৃশংস খুনের শিকার হয়েছেন। মাদকসেবী স্বামীর হাতে প্রাণ গেছে ২৫৬ জন নারীর। মাদকাসক্ত প্রেমিক-প্রেমিকার হাতে খুন হয়েছেন ৬৭০ জন তরুণ-তরুণী। একই সময়ে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৮৮৭টি। জানা গেছে, মাদক ব্যবসায়ীদের ভয়াবহ থাবায় একটি প্রজন্ম প্রায় ধ্বংসের মুখে। মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে আমাদের যুবসমাজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। এমনকি উঠতি বয়সী স্কুলমুখী কোমলমতি শিশুরাও সঙ্গদোষে জড়িয়ে পড়ছে নেশার বেড়াজালে।

অনেকে আবার অল্প বয়সে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বকে জানার নামে ঢুকে পড়ছে অন্য জগতে। রাত জেগে বিভিন্ন পর্নো সাইডে প্রবেশের পর এসব অল্প বয়সী তরুণ ও কিশোররা ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়ছে মাদকে। রাজধানীর নামিদামি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রাস্তায় বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোররাও ঝুঁকছে ভয়াবহ এ মরণনেশায়। তবে এমন কোনো পেশা নেই যেখানে মাদকাসক্ত নেই। প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট যারা এটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে সেই আইনশৃঙ্খলার সদস্যদের একাংশও এখন মাদকাসক্ত। তাই এটাকে নিয়ন্ত্রণ অনেকটা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন ও গোয়েন্দা) সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে মাদকের ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। ৬০ থেকে ৭০ লাখ লোক এ মাদকে আসক্ত। এর মধ্যে তরুণরাই সবচেয়ে বেশি। দেশে এখন প্রায় ৯ কোটি তরুণ রয়েছে। তারা প্রত্যেকেই এখন মাদকের ঝুঁকিতে। মিয়ানমার থেকে অবাধে ইয়াবা প্রবেশ করছে। এ দেশে মাদক আসা বন্ধ করার জন্য আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে অনেকবার বসেছি। তারা আমাদের প্রতিবারই আশ্বস্ত করেছে কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো নিতে পারেনি। তাদের কারখানাগুলো বন্ধ করেনি। ফলে সারা দেশে মাদক ছেয়ে যাচ্ছে। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি এটা নিয়ন্ত্রণের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদক সরবরাহ করে কোটি কোটি ডলার নিয়ে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার। দেশে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ইয়াবা ট্যাবলেট প্রবেশ করছে। দেশের প্রায় ৬৫ ভাগ তরুণ এ মরণনেশায় আসক্ত। ইয়াবার চালানের সঙ্গে প্রভাবশালীরাই বেশি জড়িত। এক গবেষণা তথ্য উঠে আসে, টেকনাফে মোট ১৩৩টি গ্রাম রয়েছে, এর মধ্যে ১০০টি গ্রামই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সেখানকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এ ব্যবসা পরিচালনা করছে। টেকনাফের যুবসমাজের অধিকাংশই ইয়াবা ব্যবসায় তাদের পুরো সময় ব্যয় করে থাকে। এটি শুধু একটি এলাকার চিত্র। এভাবে সারা দেশেই ইয়াবার বিস্তার রয়েছে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বনাশা ইয়াবা। প্রতিদিনই কোনো না কোনো অভিযানে ইয়াবার চালান বা অপরাধীদের ধরা হচ্ছে কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না এসব কারবার।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা দিলেও এর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এখন ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত। মাদক ব্যবসায়ী কাউকে গ্রেফতার করা হলেও খুব দ্রুত সে জামিনে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ভুক্তভোগীরা বলেন, মাদক থেকে এ জাতির আল্লাহ ছাড়া রক্ষা পাওয়ার উপায় নেই। আর দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে জড়িতদের ক্রসফায়ার দেওয়া।

পিডিএসও/হেলাল