সিলেটে মা-ছেলেকে হত্যা নেপথ্যে দেহ ব্যবসা

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৮, ১৫:০৮

সিলেট প্রতিনিধি

সিলেট নগরের মিরাবাজারের খারপাড়ায় মা-ছেলে খুনের ঘটনায় তান্নি-মামুন দম্পতি ফৌজধারী দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সিলেট মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) অমূল্য কুমার চৌধুরী জানান, সোমবার রাতে মহানগর হাকিম হরিদাস কুমারের আদালতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন তারা।

জবানবন্দিতে তানিয়া বেগম তান্নি বলেন, ‘জোর করে দেহ ব্যবসা ও মাদক ব্যবসা করানো এবং এর থেকে বেরিয়ে আসতে বাধা দেওয়ায় রোকেয়া বেগম শিউলী ও তার ছেলে রবিউল ইসলাম রোকনকে হত্যার পরিকল্পনা করি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তাদের হত্যা করি।’ এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তারা সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে আদালতে ১৬৪ ধারায় তানিয়া ও মামুন জবানবন্দি দেন।

গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নগরীর উপশহরস্থ তাদের কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করে। ব্রিফিংয়ে পিবিআইর বিশেষ পুলিশ সুপার রেজাউল করিম মল্লিক জানান, সিলেট নগরীর মিরাবাজারের খারপাড়ায় মা রোকেয়া বেগম ও ছেলে রবিউল ইসলাম রোকনকে হত্যাকান্ডের ঘটনায় তানিয়া আক্তারকে (২২) গ্রেফতার করে পিবিআই। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ও তানিয়ার দ্বিতীয় স্বামী ইউসুফ মামুনের (২৪) দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ঘোষহাটা গ্রাম থেকে গত সোমবার ভোরে গ্রেফতার করে তাকে সিলেটে আনা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, তানিয়া আক্তার দুই বছর আগে সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে আসেন। এখানেই পরিচয় হয় রোকেয়া বেগমের সঙ্গে। পাশাপাশি দেখা হয় মামুনের সঙ্গেও। পরে রোকেয়া বেগম তানিয়াকে বোন বানিয়ে সিলেটে রেখে দেন। এদিকে, মামুনের সঙ্গেও তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এর কয়েক দিন পরই মামুনের সঙ্গে তানিয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী আলাদা আলাদা বসবাস করতেন।

গত ৩০ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে তানিয়া, মামুন, রিপন, শিপন ছাড়াও আরো ৪-৫ জন রোকেয়ার বাসায় যান। রাত ৯টার দিকে লোডশেডিং হলে তানিয়া ও মামুন ছাড়া বাকিরা চলে যান। অন্য সময়ের মতো স্ত্রী তানিয়ার সঙ্গে মামুন থেকে যান রোকেয়ার বাসায়। রাতের খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে পরিবারের সবাইকে অচেতন করা হয়। রাত ১টার দিকে স্বামী-স্ত্রী মিলে প্রথমে রোকেয়া বেগমের কক্ষে যান। শ্বাসরোধ করার জন্য ঘুমে অচেতন রোকেয়া বেগমের মুখে কম্বল চেপে ধরেন তানিয়া আর ছুরি দিয়ে গলা কেটে ও কুপিয়ে হত্যা করেন মামুন।

এ সময় রাইসা জেগে উঠলে তার গলায় চেপে ধরে হত্যার চেষ্টা চালান মামুন। এতে রাইসা অজ্ঞান হয়ে পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত হতে তানিয়া শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করেন। পরে পার্শ্ববর্তী রুমে ঘুমে অচেতন রোকেয়ার ছেলে রোকনকেও একই কায়দায় হত্যা করেন তারা। রাত ৩টার দিকে স্বামী-স্ত্রী বাসা থেকে বের হন। ভোরে তানিয়াকে কুমিল্লার গাড়িতে তুলে দেন মামুন। এ সময় তিনি সিলেট নগরীতে অবস্থান করেন।

পিবিআইর কর্মকর্তা রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, তানিয়া ও মামুন দাবি করেছেন, রোকেয়ার বাসায় অসামাজিক কার্যকলাপ হত। নিয়মিত খদ্দেরের আনাগোনা ছিল। আর ছেলে রোকন সবকিছু জানত ও মাকে সহায়তা করত। রোকেয়ার বাসায় নিয়মিত মাদকের আসর বসত। হত্যাকান্ডের সপ্তাহখানেক আগে রোকেয়া ও তার ছেলেমেয়ে এবং তানিয়া-মামুন দম্পতিসহ আরো ৪-৫ জন কক্সবাজারে ভ্রমণ করেন। ওই ভ্রমণে আর কারা সঙ্গী ছিল, তাদের নাম জানাতে পারেননি তানিয়া।

তিনি বলেন, গত ১ এপ্রিল পুলিশ লাশ উদ্ধার করার পরপরই সন্দেহভাজনদের মোবাইল ট্র্যাকিং শুরু হয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় জানা যায়, ওই দিনই সিলেট ছাড়ে তানিয়া। সর্বশেষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাকে ট্রেস করা যায়। এর পর থেকে মোবাইল বন্ধ করে দেয়।

উল্লেখ্য, গত ১ এপ্রিল নগরীর মিরাবাজারের খারপাড়া মিতালী আবাসিক এলাকার ১৫/জে নম্বর বাসায় রোকেয়া বেগম (৪০), তার ছেলে রবিউল ইসলাম রোকনের (১৭) গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় রোকেয়ার সাড়ে ৩ বছর বয়সী মেয়ে রাইসাকে উদ্ধার করা হয়। গত এক বছর ধরে এ বাসায় ভাড়া থাকতেন তারা।

এ ঘটনায় রোকেয়ার ভাই জাকির হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাত পরিচয় ৪-৫ জনকে আসামি করে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলার পর গত বুধবার শহরতলীর বটেশ্বর এলাকা থেকে নাজমুল হোসেন নামের একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান আদালত।

পিডিএসও/তাজ