উখিয়ার মাহমুদুল হকের উত্থানের নেপথ্যে

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০১৮, ১৮:২১ | আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৮, ১৮:৫৬

বিশেষ প্রতিবেদক

‘হ্যালো, মাহমুদুল হক সাহেবের সাথে কথা বলছি?.....জ্বি। ....আমি দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ, ঢাকা থেকে.....’। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলের লাইন কেটে গেলো। এরপর অনেকবার ফোন করার পরও রিসিভ করা হয়নি। একদিন বিরতি দিয়ে আবারও মোবাইলে যোগযোগ করা হয়। আগের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হলো। মাহমুদুল হক ফোন রিসিভ করেননি। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি বারবার লাইন কেটে দেন। এরপর তাকে মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠিয়ে বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। 

বলছি খুব কম সময়ে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কোটিপতি বনে যাওয়া কক্সবাজারের উখিয়ার ইয়াবা গড়ফাদার মাহমুদুল হকের কথা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে টাঙ্গাইল থানায় গত বছর একটি মাদক মামলা হয়েছে, যার মামলা নং-৩৩(১)১৭। সেসময় মাহমুদুল হকের একটি ইয়াবা চালান টাঙ্গাইল থানা পুলিশের হাতে আটক হলে আটককৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা উদ্ধারকৃত ইয়াবা মাহমুদুল হকের বলে জানান। আরও জানা গেছে, আগেও তমব্রু ফাড়িতে মাহমুদল হকের একটি ইয়াবা চালান আটক করে ফাড়ি পুলিশ। এতেও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য টাঙ্গাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সায়েদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি উক্ত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) আবুল বাশারের কথা বলেন। যার কাছে এই মামলার বিস্তারিত জানা যাবে। যোগাযোগ করা হলে আবুল বাশার জানালেন, এইসব ক্ষেত্রে আসামিরা বিভিন্ন জনের নাম বলে থাকে। তদন্ত না করে কিছু বলতে পারছি না। 

অথচ এর আগে উক্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা নাকি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আমার কাছে উখিয়া থেকে অনেকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে মাহমুদুল হকের পক্ষে সাফাই গেয়েছে। এমন কি  ডিএসবির এক সিনিয়র অফিসার তার সাফাই গেয়ে হস্তক্ষেপ করেছেন। আমি তদন্ত সাপেক্ষে সঠিক প্রতিবেদন দেব। 

কিন্তু প্রতিদিনের সংবাদের পক্ষ থেকে কথা বলার সময় তিনি সেসব কিছু জানালেন না। এমনকি তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের কোনো এক সাংবাদিক তার পরিচিত এমন কথা বলারও চেষ্টা করলেন। যতক্ষণ তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলো তিনি মাহমুদুল হককে নিয়ে অনেক কিছু এড়িয়ে গেলেন। 

গোপন অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিন্তু কোন এক অশুভ শক্তির কারণে বারবার মাহমুদুল হক বেরিয়ে আসে আইনের ফাঁক থেকে। কোনো একটি মহল মাহমুদুল হককে আশ্রয় পশ্রয় দিচ্ছে বলে উখিয়ার নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকে জানিয়েছেন।

উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের দুছড়ি গ্রামের দরিদ্র আলীর সন্তান মাহমুদুল হক আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়ার মতোই তরতর করে সমাজের উচ্চ শিখরে নিজের অবস্থান করে নিয়েছেন। স্থানীয় অনেকের মনে এই প্রশ্ন দানা বাঁধলেও কেউ মুখ ফুটে কিছু বলছে না বলে জানিয়েছে সূত্র। দরিদ্র পিতার সংসারে অভাবের তাড়নায় ২০১৩ সালের দিকে মাহমুদুল হক মোবাইল অপারেটর কোম্পানী রবিতে চাকরী নেয়। বছর না পেরুতেই রবি কোম্পনীতে চাকরী করার পর ২০১৪ সালের দিকে তিনি যোগ দেন ব্র্যাক ব্যাংকের প্রতিষ্টান বিকাশে।

সূত্র জানিয়েছে, মুলত মাহমুদুল হকের উত্তানটা বিকাশ থেকেই। বিকাশে এসআর হিসেবে কর্মরত অবস্থায় তিনি জড়িয়ে পড়েন ইয়াবা ও হুন্ডি বানিজ্যে। বিকাশকর্মী হিসেবে তার এলাকা ছিল পালংখালী, থাইনখালী, বালুখালী ও কুতুপালং বাজার। সীমান্তবর্তী এলাকায় যাতায়াতের সুবাধে তার সাথে সখ্য গড়ে উঠে সীমান্তের চিহিৃত ইয়াবা গড়ফাদারদের সাথে। হাতে বিকাশের টাকা থাকার সুবাধে ইয়াবার চালান আনতে তাকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। শুধু ইয়াবা নয়, হুন্ডি বানিজ্যেও জড়িয়ে পড়েন তিনি।

হুন্ডি বানিজ্য অনায়াসে চালিয়ে যেতে উখিয়া সদর মসজিদ মার্কেটে বিছমিল্লাহ টেলিকম নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্টানও খুলে বসেন। সেখানেও প্রকাশ্যে নিয়মিত হুন্ডির টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মাহমুদুল হকের ইয়াবা সিন্ডিকেটে রয়েছে একটি তরুনদল। তাদের কাজ হচ্ছে মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে আসা গড়ফাদার মাহমুদুল হকের ইয়াবা দেশের বিভিন্নস্থানে পাচার করা। ইয়াবা পাচার করে মাহমুদুল হক নামে বেনামে অল্প বয়সে অঢেল সম্পদের মালিক এখন।

তার রয়েছে একাধিক নোহা গাড়ি, ডাম্পারসহ নামে বেনামে বিপুল পরিমান সম্পদ। প্রকাশ্যে এ অবৈধ বানিজ্য চালিয়ে গেলেও একবারও তাকে গ্রেফতার হতে হয়নি। এলাকায় ব্যাপকভাবে প্রচার আছে, মাহমুদুল হক থানা পুলিশ ও প্রশাসন ম্যানেজ করেই এ বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। কেন এই ইয়াবা গডফাদার বারবার আইনের হাত থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে তা র‌্যাব প্রশাসনকে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন উখিয়ার সচেতন মহল।

এ বিষয়ে উখিয়ার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল খায়েরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কোন মাহমুদুল হক কিভাবে বুঝব। ইয়াবা ব্যবসায়ীরা কি দোকান নিয়ে বসে যে তাদের আমরা চিনব। আমাদের কাছে এর নামে কোনো অভিযোগ নেই। 

পিডিএসও/রিহাব