গবাদি পশুতে ভারতে ১০ হাজার কোটি টাকা পাচার

দেড় শতাধিক হুন্ডি কারবারি সক্রিয়

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১১:০৫

সেখ জিয়াউল হক, রাজশাহী

গত সাড়ে চার বছরে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ঢুকেছে প্রায় ২০ লাখ গবাদিপশু। গড়ে ৫০ হাজার টাকা করে এসব পশুর মূল্য পরিশোধ বাবদ ভারতে পাচার হয়েছে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, এখনো গবাদিপশু আমদানিতে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় কোনো লেনদেন নেই। পুরোটাই হচ্ছে চোরাচালানি-টু-চোরাচালানির মধ্যে। বিনিময়ে কখনো স্বর্ণ আবার কখনো হুন্ডিতে পাচার হচ্ছে অর্থ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সীমান্ত পথে ভারত থেকে গবাদিপশু আসে চোরাচালানের মাধ্যমে। মালিক থাকলেও কাগজ-কলমে মালিকবিহীন দেখিয়ে বিজিবি এসব পশু জব্দ করে। পরে মালিক দাবি করে ৫০০ টাকা রাজস্ব দিয়ে বৈধ করে দেশের মধ্যে চালান করা হয়।

গরু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতে একটি মাঝারি মানের গরুর দাম পড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার ভারতীয় রুপি। ছোট গরুর দাম অন্তত ১৫ থেকে ২০ হাজার রুপি। আর বড় গরু বা মহিষ একটি কিনতে গুনতে হয় ৩০ থেকে ৪০ হাজার ভারতীয় রুপি। এই চোরাচালানে এপার-ওপার দুই পারেই রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

ওপারে সিন্ডিকেটে রয়েছে রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা। ওই সিন্ডিকেট এজেন্টকে প্রতিটি গরু-মহিষে ঘুষ দিতে হয় ২০ হাজার টাকা করে। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসার পর এপারের সিন্ডিকেটকে গরু প্রতি চাঁদা দিতে হয় আরো ৫ হাজার টাকা। কেনা থেকে শুরু করে সব মিলিয়ে প্রতিটি গরু-মহিষের দাম পড়ে বাংলাদেশি টাকায় কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা।

রাজশাহী কাস্টমস কমিশনার দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলের ৯টি করিডোর দিয়ে সীমান্ত পথে ভারত থেকে গবাদিপশু এসেছে ১৮ লাখ ৮৫ হাজার ৩৮৯টি। একই সময় করিডোর বা খাটালকে বাইপাস করে গবাদিপশু এসেছে আরো তিন লাখের ওপরে। সবমিলিয়ে এতে ভারতে পাচার হয়েছে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা। আর প্রতিটি ৫০০ টাকা হিসাবে ১৮ লাখ ৮৫ হাজার ৩৮৯ গবাদিপশু থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ১০০ কোটি ৭৯ লাখ ৪৬ হাজার ৬০০ টাকা। তবে দ্বিপক্ষীয় লেনদেন অথবা টাকা পাঠানোর বৈধ চ্যানেল থাকলে রাজস্ব আয় বাড়ত আরো কয়েকগুণ।

ব্যবসায়ীরা জানান, চোরাচালানে ওপারে কখনো গবাদিপশুর মূল্য পরিশোধ হচ্ছে স্বর্ণ দিয়ে। এছাড়া অবৈধ অর্থ লেনদেনে এ অঞ্চলে হুন্ডি ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত বিভিন্ন সীমান্ত, হাটঘাটসহ গরুর হাটে দেড় শতাধিক হুন্ডি কারবারি প্রকাশ্যেই চালাচ্ছে টাকা পাচারের কাজ। অন্তত ১৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে প্রতিদিনই জমা হচ্ছে কয়েকশত কোটি হুন্ডির টাকা। চট্টগ্রাম ও দুবাই হয়ে এসব টাকা পাচার হচ্ছে ভারতে।

গত ১১ ডিসেম্বর রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ১৫০ ভরি ওজনের ১৫টি স্বর্ণ বারসহ লিটন আলী শেখ (৩০) নামের এক পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে লিটন জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুর গরু হাটে এক হুন্ডি ব্যবসায়ীর কাছে এই স্বর্ণ হস্তান্তরের কথা ছিল। বিষয়টি তদন্তাধীন বলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে চাননি মাদক নিয়ন্ত্রণ বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত এখন স্বর্ণ পাচারের অন্যতম রুট। গরুর বদলে স্বর্ণ যাচ্ছে এই দুই জেলার সীমান্ত পথে।

একটি গোয়েন্দা সূত্র থেকে জানা যায়, রাজশাহীর সিটি হাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুর হাট ও গোদাগাড়ীতে দেড় শতাধিক হুন্ডি কারবারি টাকা পাচারে যুক্ত। তারা গবাদিপশু বিক্রির টাকা জমা নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় হুন্ডি চ্যানেলে টাকা দিচ্ছেন। পরে ভারতের মুর্শিদাবাদের উমরপুর, জঙ্গিপুর, লালগোলাসহ কলকাতায় গিয়ে জমা হচ্ছে এসব টাকা।

এদিকে রাজশাহী কাস্টমস কমিশনার দফতর থেকে জানা যায়, এখনো গবাদিপশু আসছে রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ, রাজাবাড়ী, শ্যামপুর ও চারঘাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট, ভোলাহাট ও বাখেরআলী, নওগাঁর খঞ্জনপুর এবং জয়পুরহাটের কড়িয়া করিডোর হয়ে। এর মধ্যে বাখেরআলী করিডোর চালু ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে বন্ধ রয়েছে কড়িয়া করিডোর।

এ কয়েক বছর সবচেয়ে বেশি ৮ লাখ ২০ হাজার ৪০০ গবাদিপশু এসেছে সুলতানগঞ্জ করিডোর দিয়ে। এরপর যথাক্রমে কানসাটে ৬ লাখ ৭ হাজার ৮০০, রাজাবাড়ীতে ১ লাখ ৫৪ হাজার, ভোলাহাটে ১ লাখ ৮ হাজার ৫০০, খঞ্জনপুরে ৯৪ হাজার, শ্যামপুরে ৩৭ হাজার ৭০০, কড়িয়ায় ৩১ হাজার, বাখেরআলীতে ১৫ হাজার ৩০০ এবং চারঘাটে ১৪ হাজার ৫০০ গবাদিপশু ঢুকেছে।

কাস্টমস সূত্র জানিয়েছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৬০৯টি পশুর বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয় ৪০ কোটি ৫৯ লাখ ১২ হাজার ৪০০ টাকা। পরের অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২৬ কোটি ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ৪০০ টাকা। সেবার পশু এসেছে ৫ লাখ ২২ হাজার ৭৬৪টি। গত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এ চার মাসে পশু এসেছে ৩ লাখ ৯৭ হাজার ১০৮টি। এর বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১৯ কোটি ৮৫ লাখ ৫৯ হাজার ৭০০ টাকা।

দেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে টাকা পাচারের কথা স্বীকার করেন রাজশাহী বিভাগীয় কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি বলেন, গরু আমদানি হচ্ছে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তে। কিন্তু ওপারে এ কারবার পুরো অবৈধ। ফলে লেনদেনের স্বীকৃত কোনো মাধ্যম নেই। অবৈধভাবেই টাকা ভারতে পাচার হচ্ছে, এটা সবাই জানে। এখানে আমাদের কিছুই করার নেই।

পিডিএসও/তাজ