দর্শনার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা ঘুষ!

*কক্সবাজার কারাগারে জেলারের সিন্ডিকেট *মুখ খুললে বন্দির ওপর নির্যাতনের হুমকি

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০১৮, ১০:১০ | আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০১৮, ১০:১৯

মহসীন শেখ, কক্সবাজার

কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাতের সময় ঘুষ গ্রহণ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। বর্তমানে তা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সীমা ছাড়িয়েছে। ঘুষের এই অংক মাসে লাখ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বেপরোয়া এই ঘুষ আদায়ের পেছনে আছেন জেলার শাহাদাত হোসেন। তাকে কেন্দ্র করে কারাগারে একটি দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। তার অনুগত কয়েক কারারক্ষীর মাধ্যমে এই কর্মকর্তা কারাগারে অনিয়ম-দুর্নীতি করছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তবে জেলার শাহাদাত হোসেন এই ঘুষ লেনদেনের কথা অস্বীকার করেছেন।

ভুক্তভোগীরা জানান, কারাগারে দায়িত্বরত কারারক্ষীরা একেকজন বন্দির সঙ্গে দেখা করতে দাবি করেন দুই থেকে তিন হাজার টাকা। সর্বনিম্ন ১২০০ থেকে শুরু করে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিলেই ‘অফিস কল’ হিসেবে বন্দিকে বিশেষ ব্যবস্থায় সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়া হয়। আর যারা সাধারণ কক্ষে সাক্ষাৎ করতে আসেন সেসব প্রার্থীকে ঘুষ দিতে হয় সর্বনিম্ন ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। অন্যথায় সারাদিন বসে থেকে বন্দির সাক্ষাৎ না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন স্বজনরা। এ কারণে প্রতিদিন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা শতাধিক সাক্ষাৎপ্রার্থী বন্দির সাক্ষাৎ না পেয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। কারাগার সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, কারাগারে গড়ে দৈনিক ৫০ থেকে ৭০টি পর্যন্ত ‘অফিস কল’ হয়। অফিস কলে বন্দির সঙ্গে সাক্ষাতে নেওয়া হয় সর্বনিম্ন ১২০০ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। সেই হিসেবে গড়ে প্রতিদিন অফিস কলেই ঘুষ আসে লাখ টাকার ওপরে। আর কারাগারের সাক্ষাৎকক্ষে আগে ৫ টাকার টিকেটে সাক্ষাতের নিয়ম ছিল। এখন ফ্রি সাক্ষাতের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ফ্রি বলা হলেও সেখানে ঘুষ দিতে হয় সর্বনি¤œ ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ যার কাছ থেকে যা পাওয়া যায় তাই হাতিয়ে নেওয়া হয়। এভাবে সাক্ষাৎ প্রার্থী দরিদ্র লোকজনের কাছ থেকেই প্রতিমাসে গড়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে ১০ লাখ টাকার মতো।

সূত্র আরও জানায়, ‘অফিস কল’ নামে টাকা আদায়ের নেতৃত্ব দেন খোদ কারাগারের জেলার শাহাদাত হোসেন। কারা ফটকের বাইরে টাকা আদায় করেন জেলার শাহাদাতের বিশ্বস্ত কারারক্ষী আসলাম। কারারক্ষী আসলাম ‘সিভিল পোশাকে’ সাক্ষাৎপ্রার্থীর কাছ থেকে টাকা আদায় এবং বিনিময়ে সাক্ষাতের টোকেন দেওয়ার কাজ করেন। আসলামের টোকেন হাতে পেলেই কারা ফটকে থাকা কারারক্ষীরা বন্দিকে ডেকে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েক ভুক্তভোগী জানান, বন্দি ও কয়েদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা লোকজনের কাছ থেকে প্রথমেই জানতে চাওয়া হয়, বন্দি কোন মামলায় আটক আছেন এবং কোন এলাকার বাসিন্দা। বন্দি যদি ইয়াবা মামলায় আটক এবং উখিয়া-টেকনাফের বাসিন্দা হন, তাহলে বেড়ে যায় ঘুষের দর। তখন নানাভাবে হুমকিধমকি দিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া মামলায় যদি ইয়াবার সংখ্যা বেশি হয়, তাহলে ‘উপরের নির্দেশে সাক্ষাৎ বন্ধ’ উল্লেখ করে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। আর কারাগারে আটক বন্দির ওপর নির্যাতন হতে পারে, এমন আশঙ্কায় এসব ব্যাপারে বাইরে মুখ খোলেন না বন্দির স্বজনরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জেলা কারাগারে আটক বন্দির সঙ্গে সাক্ষাতে টাকা আদায়ের কোনো নিয়ম নেই। প্রতিদিন দুই শতাধিক সাক্ষাৎপ্রার্থী এলেও বন্দির সঙ্গে দেখা মেলে অর্ধেকেরও কম সাক্ষাৎপ্রার্থীর। বাকিরা ফিরে যান দায়িত্বরত কারারক্ষীর দাবিকৃত ঘুষ দিতে না পারার কারণে।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে আরও জানান, কারারক্ষীদের দাবিকৃত ঘুষ দিতে পারলেই বন্দির নাম-ঠিকানা নিয়ে সাক্ষাৎকক্ষে ডেকে আনা হয়। আর বন্দিকে সাক্ষাতে ডেকে আনতে কারারক্ষীরা ১০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করেন। দেনদরবার করে সর্বনিম্ন ৩০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে রফা হয়। এরপরই বন্দিকে ডেকে এনে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। আর যারা দাবিকৃত ঘুষ দিতে পারেন না তাদের সারাদিন অপেক্ষা করে বিকেলে ফিরে যেতে হয়। এমনকি অনেক সাক্ষাৎপ্রার্থীকে টিকিট দিলেও তা এন্ট্রি করা হয় না। এ অবস্থায় চকরিয়া, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, রামু, উখিয়াসহ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা লোকজন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কক্সবাজারের বাইরে থেকে আসা লোকজনকেও একইভাবে হয়রানি করা হয়। বিশেষ করে দূর থেকে আসা গরিব ও অসহায় লোকজনই হয়রানির শিকার হচ্ছেন বেশি। ঘুষ দিতে না পেরে আপনজনের দেখা না পেয়ে তারা কান্নাকাটি করেই ফিরে যাচ্ছেন গন্তব্যে। এতে কারাগারের বাইরে মাঝেমধ্যেই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হচ্ছে।

চকরিয়া থেকে আসা আবুল কালাম (ছন্দনাম) নামে এক সাক্ষাৎপ্রার্থী বলেন, ‘পত্রিকায় এসব লিখে লাভ নেই। জেলখানা আলাদা একটি জগৎ। এখানে ইট-দেয়ালেও ঘুষ খায়। এখানে টাকা দিলে সব ফ্রি। টাকা না দিলে জেলখানা কাকে বলে দেখিয়ে দেবে।’ তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভেতরের বিষয় আলাদা। বাইরে টাকা নেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্য, এসব সবাই দেখছে, কই কিছুই তো হচ্ছে না।’

উখিয়ার রহিমা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে ইয়াবা মামলায় আটক হয়েছে কয়েক দিন আগে। সে অসুস্থ। তাকে দেখতে পরিবারের কয়েকজনকে নিয়ে কারাগারে যাই। সেখানে জানতে চাওয়া হয়- কাকে দেখবে, তার মামলা কী, বাড়ি কোথায় ইত্যাদি। যখন বলি, সে ইয়াবা মামলায় আটক এবং বাড়ি উখিয়ায়, তখনই একটু সময় নিয়ে ওই কারারক্ষী মোবাইলে একজনের সঙ্গে কথা বলেন। কথা বলার পর ওই কারারক্ষী জানান, ‘উপরের নির্দেশ আছে তার সঙ্গে দেখা করা যাবে না। যদি দেখা করতে হয়, তাহলে ১০ হাজার টাকা লাগবে।’ পরে কারারক্ষীর হাতেপায়ে ধরে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে তারা দেখা করেন বন্দির সঙ্গে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেলার শাহাদাত হোসেন বন্দি-সাক্ষাতে টাকা নেওয়া হয় না বলে দাবি করেন।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কক্সবাজার জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক মো. বজলুর রশিদ আখন্দ বলেন, ‘টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। সবাই তো বন্দির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেই যাচ্ছেন। আমার জানা মতে, কেউ টাকা নেয় না। এরপরও কেউ টাকা নিয়ে থাকলে বা অনিয়ম-দুর্নীতি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পিডিএসও/হেলাল