জঙ্গি অর্থায়নে জড়িত থেকেও ধরাছোঁয়ার বাইরে!

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:৪৩

গাজী শাহনেওয়াজ

টানা দু’মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি’ তৎপরতায় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিমিটেড নামক সমবায় সমিতি। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা এবং হরতাল, অবরোধসহ নানা জঙ্গি কার্যক্রমে জামায়াত-শিবিরকে অর্থায়ন করে আসছে। এ তথ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে প্রমাণিত। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হলেও তা এখনো উপেক্ষিত। একইসঙ্গে, সমবায় অধিদফতরের কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত কমিটি করে দেড় মাসে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও গত চার মাসেও অগ্রগতি নেই। এই নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। কমিটি প্রশ্ন তুলেছে, রাষ্ট্রদ্রোহী এই প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্য কে থামাবে?

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের তথ্যমতে, যেকোনো সমবায় সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটি সরকারি কর্মকর্তা ছাড়া গঠন করার বিধান নেই। এটা সমবায় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর তোয়াক্কাও করেনি বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি। পরে সমবায় কর্তৃপক্ষ সমবায় অধিদফতরের তিন কর্মকর্তার সমন্বয়ে গত বছরের ১৬ মে পাল্টা অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি গঠন করে। তিন সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক করা হয় আবু তাহেরকে। জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী থাকাকালীন সূর্যসেন হল সংসদের ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবু তাহের। ফলে নিজ দল ও রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত-শিবিরের কর্মকাণ্ডকে ধামাচাপা দিয়ে যায় ওই কমিটি। পরে অধিদফতরের করা তিন সদস্যের কমিটির গঠন প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে সমিতি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে।

বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্বর্তী কমিটির আহ্বায়ক করায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খোন্দকার মোশাররফ হোসেন ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, এই আবু তাহের কে? এত অপকর্ম করে এরা কিভাবে সমবায় অধিদফতরে কর্মরত রয়েছে। মন্ত্রী এ ধরনের বিতর্কিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, জঙ্গি তৎপরতা, নাশকতা এবং জামায়াত-শিবিরকে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে অর্থের জোগান দেওয়া বুক সোসাইটিকে রক্ষায় সমবায় অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িত রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ ওই অধিদফতরের কর্মকর্তাদের দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা চার মাসেও তা দিতে পারেনি।

এই নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে সংসদীয় কমিটি। স্থানীয় সরকার সংসদীয় কমিটির সভাপতি আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, দীর্ঘ চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও যারা প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা কী তদন্ত করবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। চরম ক্ষোভ জানিয়ে সভাপতি সংশ্লিষ্টদের জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদন কমিটিতে উত্থাপন করার নির্দেশ দেন।

কমিটির ১৮তম বৈঠকের ২১নং সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব বলেন, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটির ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা এবং হরতাল ও অবরোধে জামায়াত-শিবিরকে অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। এই নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করা হলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে সচিব বলেন, এই সমিতির অনেক সদস্য জামায়াত-শিবির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। পাশাপাশি এখানকার অনেক পরিচালক হরতাল, অবরোধ, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কমিটির গত বৈঠকে অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও মামলা করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটির অতীত কর্মকান্ডের চিত্র তুলে ধরে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সরকার হটানোয় মদদ জোগাতে অর্থ সহায়তাসহ সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা প্রমাণিত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এটা খুবই দুঃখজনক।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙা বলেন, কমিটির বৈঠকে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনেক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হয় না। সমিতির নামে এসব সন্ত্রাসী কার্যক্রম করে কিভাবে এরা পার পেয়ে যায়, তা জানতে চান প্রতিমন্ত্রী। সমবায় অধিদফতরকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে কোনো সমিতি অবৈধ কর্মকান্ড পরিচালনার সাহস পেত না।

অডিট প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা কমিটি ফাঁসিতে ঝোলা জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও মীর কাসেম আলী এবং আমৃত্যু কারাদন্ডপ্রাপ্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাককে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা প্রদান করে। তারা জামায়াত-শিবিরকে হরতাল ও অবরোধসহ রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ডে অর্থও দেয়।

সোসাইটির মতিঝিল অফিসে জামায়াত-শিবির কর্মীদের নিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কাজের দিকনির্দেশনা প্রদান ছাড়াও জামায়াত-শিবিরের বই প্রকাশ করা হয়। অভিযোগগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। পরে তদন্ত করেন সমবায় অধিদফতরের সহকারী নিবন্ধক শাকিলা হক। তার তদন্তের ভিত্তিতে সমিতিটির ব্যবস্থাপনা কমিটির ১১ সদস্যকে সমহারে ১১ লাখ ২৬ হাজার ২৬৬ টাকা ১৯ পয়সা করে মোট ১ কোটি ২৩ লাখ ৮৮ হাজার ৯২৮ টাকা জরিমানা করা হয়।

পিডিএসও/হেলাল