লিটন, সাদিক জয়ী : সিলেটে হাড্ডাহাড্ডি

প্রকাশ | ৩১ জুলাই ২০১৮, ০৮:০৫ | আপডেট: ৩১ জুলাই ২০১৮, ১২:২৮

বিশেষ প্রতিনিধি

সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে এবারও জয় পেল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। গতকাল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিন সিটি করপোরেশনের মধ্যে রাজশাহী ও বরিশালে বড় অঙ্কের ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থীদের হারিয়ে সহজেই এখানে জয় তুলে নেন নৌকার প্রার্থীরা। তবে সিলেটে নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সেখানে মাত্র ১ হাজার ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে ছিল নৌকা।

এর আগে গত মে ও জুনে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও বিএনপির ধানের শীষকে হারিয়ে মেয়র পদে জয় পায় আওয়ামী লীগের নৌকা। এর ফলে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি করপোরেশনের মধ্যে এখন পর্যন্ত চারটিতেই জয় পেল ক্ষমতাসীনরা।

গতকাল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বরিশাল ও রাজশাহীতে মেয়র পদে বড় ভোটের ব্যবধানের জিতেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। বরিশালে ১২৩ কেন্দ্রের মধ্যে ৯৯ কেন্দ্রের ফলে এগিয়ে আছে নৌকা। এখানে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ মোট ভোট পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৪০। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার ভোট পেয়েছেন ১২ হাজার ৭৬৭। এখানে ধানের শীষের চেয়ে ৮২৬৭৩ ভোট বেশি পেয়ে এগিয়ে আছেন নৌকার সাদিক আবদুল্লাহ। ফলে কেন্দ্র বিবেচনায় এখানে আওয়ামী লীগের জয় নিশ্চিত বলা চলে।

রাজশাহীতে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের খায়রুজ্জামান লিটন ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৯৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল পেয়েছেন ৭৮ হাজার ৪৯২ ভোট। এখানে আওয়ামী লীগ জিতেছে ৮৭ হাজার ৯০২ ভোটের ব্যবধানে।

তবে সিলেটে নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সেখানে ১৩৪ কেন্দ্রের মধ্যে ১০৬ কেন্দ্রের ফল পাওয়া গেছে। এতে মাত্র ১ হাজার ১২৯ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন আওয়ামী লীগের বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। তিনি ভোট পেয়েছেন ৭১ হাজার ২১১। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের আরিফুল হক চৌধুরী পেয়েছেন ৭০ হাজার ৮২ ভোট। ফলে এখানে কে হাসবে বিজয়ের হাসি—তা গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না।

এর আগে গত জুনে অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৪ লাখ ১০ ভোট পেয়ে মেয়র পদে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের জাহাঙ্গীর আলম। মাত্র ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১১ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। সেখানে ধানের শীষের চেয়ে নৌকা প্রতীক ২ লাখের বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিল। এর আগে ২০১৩ সালে এ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ে ১,০৬,৫৭৭ ভোট বেশি পেয়ে বিএনপি প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছিল। গত ১৫ মে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও বিএনপি প্রার্থীর চেয়ে ৬৭ হাজার ৯৪৬ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন নৌকা প্রতীক নিয়ে তালুকদার আবদুল খালেক। এমনকি মেয়র পদের পাশাপাশি এসব সিটিতে সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলেও বেশিরভাগ পদে জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থকরা।

এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখল আওয়ামী লীগ। একইভাবে তৃণমূলে সরকারের জনপ্রিয়তাও স্পষ্ট হলো। এসব নির্বাচনে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ও কারচুপির অভিযোগ না ওঠায় অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নেও আরেক ধাপ এগিয়ে গেল ক্ষমতাসীনরা। আওয়ামী লীগ মনে করছে, দলের সাংগঠনিক ঐক্য ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হয়েই ভোটাররা নৌকা প্রতীককে বিজয়ী করেছে। এর ফল জাতীয় নির্বাচনেও দলের পক্ষে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দ্বিধান্বিত ভোটারদের পক্ষে টানতে সহজ হবে ক্ষমতাসীনদের।

পক্ষান্তরে এই পাঁচ সিটির কোনোটিতেই জয় না পাওয়ায় বেশ উদ্বিগ্ন ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। বিশেষ করে বড় ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হওয়ায় জাতীয় নির্বাচনেও দলের অবস্থান নিয়ে শঙ্কিত দলের নেতারা। এমনকি এসব নির্বাচনে ভোটের পরিবেশ ও অনিয়ম নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের কোনো অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত করতে না পারায় জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারেও আর কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত করতে পারবে না বিএনপি। ফলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নেও পিছিয়ে পড়ল দলটি।

গতকাল সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলে তিন সিটিতে। তিন সিটিতে মোট ১৪টি কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হয়েছে। এসব সিটিতে মোট ভোটার ৯ লাখ। মেয়র প্রার্থী ছিলেন ১৮ জন। এর মধ্যে রাজশাহীতে পাঁচজন, বরিশালে ছয়জন এবং সিলেট সিটিতে সাতজন। মোট ভোট কেন্দ্র ৩৯৫। এর মধ্যে রাজশাহীতে ১৩৮ ভোট কেন্দ্র ও ভোটার ৩ লাখ ১৮ হাজার ১৩৮ জন, বরিশালে ১২৩টি ভোট কেন্দ্র ও ভোটার ২ লাখ ৪২ হাজার ১৬৬ জন এবং সিলেটে ভোট কেন্দ্র ১৩৪টি ও ভোটার ৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ জন।

প্রাথমিক হিসেবে ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পড়তে পারে বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন। ভোট চলাকালীন উৎসবমুখর ছিল পরিবেশ। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন ভোটাররা। ভোট গণনা পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকা ছিল মুখর। ভোট গণনা শেষে তিন সিটিতেই বিজয়ীর পক্ষে উল্লাসে রাস্তায় নেমে আসে মানুষ। বিজয় মিছিল করে। মিষ্টি বিতরণ করে। এ সময় ভোটের ফল প্রচার কেন্দ্র ও বিজয়ী প্রার্থীর বাসভবনকে ঘিরে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঢল নামে। মধ্যরাত অবধি আনন্দ উৎসব চলছি।

অবশ্য ভোট চলাকালীন তিন সিটিরই বেশকিছু কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার খবরও পাওয়া গেছে। সকাল ৮টায় ভোট শুরুর পর থেকেই কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেওয়া, এজেন্টদের ঢুকতে না দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ করতে থাকেন বিএনপির মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা। তবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ও সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বিএনপির অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, বিএনপি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং নিশ্চিত পরাজয় জেনে এসব অভিযোগ করছে।

ঢাকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে ভোট নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। আওয়ামী লীগ বলছে, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। বিএনপির অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলেছে দলটি। অন্যদিকে বিএনপি এই নির্বাচনকে বলেছে নীলনকশার নির্বাচন। সিলেটে ভোট দিতে এসে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিএনপির অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, বিএনপির আসলে কোনো লোকজনই নেই। সেজন্য তারা এজেন্ট পায়নি। এখন মিথ্যাচার করছে।

বরিশালে নানা অনিয়মের কথা তুলে ধরে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ভোট বর্জন করেন বরিশালে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার। এর পরপরই ভোট বর্জন করেন বাসদের মনীষা চক্রবর্তী, ইসলামী আন্দোলনের ওবাইদুর রহমান। আর জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস ভোট স্থগিতের দাবি জানান।

সিলেটে বিএনপির প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট অভিযোগ করেছেন মোট ৪১টি কেন্দ্র দখল করে সরকারদলীয় ব্যক্তিরা জাল ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে রাজশাহীতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেছেন ৭৬টি কেন্দ্রে অনিয়ম, জাল ভোটের ঘটনা হয়েছে।

সিলেট ও রাজশাহীতে বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা বারবারই বলেছেন, যাই হোক না কেন তারা শেষ পর্যন্ত ভোটে থাকবেন এবং শেষ পর্যন্ত থেকেছেনও। তবে সিলেটে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক ভোট বাতিলের জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করেছেন। এতে তিনি ৪১টি কেন্দ্রের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেন। এর আগে নগরের কাজী জালালউদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শন করে নিজ কার্যালয়ে গিয়ে বলেন, এবার ভোট চুরির ঘটনা সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এমনটা সিলেটে আগে কখনো হয়নি। মানুষের ভোটাধিকারহরণ করা হয়েছে। ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার আন্দোলনের ডাক দেবেন বলে তিনি জানান। এছাড়া মেয়র পদে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত প্রার্থী মো. আবু জাফর ‘নজিরবিহীন কারচুপির’ অভিযোগ এনে সব কেন্দ্রের ভোট বাতিলের আবেদন করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলীমুজ্জামানের কাছে।

তবে এসব অভিযোগ আমলে নেয়নি নির্বাচন কমিশন ও আওয়ামী লীগের নেতারা। ভোট গ্রহণ শেষে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণ’ ভোট হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, অনিয়ম ও গোলযোগের কারণে বরিশালের একটি ও সিলেটের দুইটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছ। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বরিশালে ১৫টি কেন্দ্রের ফল স্থগিত করা হয়েছে। রাজশাহীতে কোনো কেন্দ্র স্থগিত হয়নি। রাজশাহীতে ১৩৮টি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। সিলেটে ১৩৪টির মধ্যে দুইটি ব্যতিত বাকিগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়েছে। বরিশালে ১২৩টির মধ্যে সকালে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। ইসি তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে।

বিকালে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে তিন সিটি নির্বাচন নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নির্বাচন নিয়ে সন্তুষ্ট প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অভিযোগের সমালোচনা করে বলেন, তিন সিটিতে বিএনপি নির্বাচনের জন্য অংশ নেয়নি। তাদের উদ্দেশ্যই ছিল নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বহির্বিশ্বে সরকারের ইমেজ নষ্ট করা। বিএনপি তিন সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নামে অভিনয় করেছে। তারা আগেই ঠিক করে রেখেছে সকালে কী বলবে, বিকালে কী বলবে। এর আগে ভোট শুরুর পর এক প্রতিক্রিয়ায় দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফও নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে বলে দাবি করেন। এ সময় তিনি তিন সিটিতেই আওয়ামী লীগের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

পিডিএসও/হেলাল