সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয় পূর্ণতা পায়নি ২০ বছরেও

দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ছে

প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৫:৪৫

হাসান ইমন

দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে ১৯৯৬ সালে রাজধানীতে সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত

করা হয়েছিল বেইলি রোড, শিল্পকলা একাডেমি, শহীদ মিনার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বাংলা একাডেমি, শাহবাগ, হোটেল রূপসী বাংলা ও রমনা পার্ক এলাকা। এসব এলাকার ২৬টি স্থাপনাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল সাংস্কৃতিক বলয়ের আওতায় নিয়ে আসার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধ, নিয়াজীর আত্মসমর্পণ, ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ভাষা আন্দোলনসহ বাংলাদেশের উত্থানপর্বের সঙ্গে সাধারণ মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

কিন্তু গত ২০ বছরেও এই প্রকল্প পূর্ণতা পায়নি। কবে নাগাদ প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে সংশ্লিষ্টদের কেউ বলতে পারছেন না। ইতোমধ্যেই ওই সাংস্কৃতিক বলয় নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয়কে কেন্দ্র করে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য অনুসন্ধান ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সমুন্নত রাখার ভাবনা নিয়ে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ প্রকল্প হাতে নেয়। পরে ১৯৯৭ সালের ৮ জুলাই শিল্পকলা একাডেমিতে এর ভিত্তিপ্রস্তরের উদ্বোধন করা হয়। ওই সরকারের আমলে এ প্রকল্পের তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এলে প্রকল্পটি একেবারেই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। পরে ২০০৮-এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় এসে আবারও সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনাটি ফের প্রাণ ফিরে পায়। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে।

শেখ হাসিনা দ্বিতীয় মেয়াদে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বইমেলা উদ্বোধনকালে দ্বিতীয় দফায় সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। এরপর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে যৌথ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পূর্ত, তথ্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বেশ কিছু মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর এ প্রকল্পের অধীনে কাজ করবে বলে ঠিক করা হয়। সে সময় প্রাথমিকভাবে ‘সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয়’ শীর্ষক এ প্রকল্পের মূল এলাকা হিসেবে ধরে নেওয়া হয় ঢাকাকে।

সংস্কৃতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ২০১০ সালের ১১ জুলাই অনুষ্ঠিত এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এ প্রকল্পের নতুন খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সে সময় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য স্থাপত্য অধিদফতরের তৎকালীন প্রধান স্থপতি ইসমাইল হোসেনকে প্রধান করে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে ২৫৩ ফুট দৈর্ঘ্যরে ও ১২৬ ফুট প্রস্থের একটি ভূ-গর্ভস্থ জাদুঘর নির্মাণের কথা। এ ছাড়া স্তম্ভ লাগোয়া চত্বরে ৬০ ফুট ব্যাসের বৃত্তাকার জলাধার ও পাথুরে দেয়ালে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক ম্যুরাল নির্মাণের পরিকল্পনা ছাড়াও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সম্প্রসারণ এবং শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্কের যোগাযোগ স্থাপনের জন্যে উড়াল সেতু নির্মাণের কথা রয়েছে। এ বলয়ের প্রতি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নাট্যমঞ্চ, অডিটরিয়াম ও আধুনিক রেস্তোরাঁ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। আছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও উপস্থাপন এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্মারকগুলো সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ঢাকার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত কিছু ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ করে সাংস্কৃতিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা।

তৃতীয় ধাপের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদফতরের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয় তৃতীয় প্রকল্পের জন্য ফাইল মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্য থেকে স্বাধীনতাস্তম্ভের প্রকল্পটি অনুমোদন হয়ে এসেছে। আগামী বছরের শুরুর দিকে কাজ শুরু হতে পারে।

এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। নতুন আরো কিছু স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হবে স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মারক সংবলিত দেশের সেরা বিনোদনকেন্দ্র।

জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০০৭ সালের জুন পর্যন্ত। এর জন্য অর্থ বরাদ্দ ছিল ৭৬ কোটি ৪ লাখ টাকা। প্রকৃত ব্যয় হয় ৬৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে শিখা চিরন্তন, ম্যুরাল, ভূগর্ভস্থ জাদুঘরের অবকাঠামো, উন্মুক্ত মঞ্চ, ওয়াটার বডি (আংশিক), শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সিসিটিভি স্থাপন, ফায়ার ফাইটিং ও সাউন্ড সিস্টেম, আংশিক ওয়াকওয়ে, ভিআইপি ও সার্ভিস ব্লক ও ব্লক জোন সজ্জিতকরণ ইত্যাদি।

দ্বিতীয় ধাপের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত। বরাদ্দ ছিল ১৮১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ব্যয় হয়েছে ১৭৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্লাজা চত্বরে নির্মিত গ্লাস টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। স্টিল ফ্রেমের টাওয়ারটির উচ্চতা ১৫০ ফুট এবং দৈর্ঘ্য ১৯ মিমি ও প্রস্থ ৭৫ মিমি। রয়েছে জাদুঘরের ভেতরে পানির ফোয়ারা ও ১৫৬ আসনবিশিষ্ট অডিও ভিজ্যুয়াল কক্ষ।

এদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত স্বাধীনতাস্তম্ভ ও স্বাধীনতা জাদুঘর খুলে দেওয়ার পর থেকে দর্শনার্থীদের ভিড় বেড়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক থাকছে আনসার বাহিনী। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার জন্য নিয়োজিত রয়েছে পরিচ্ছন্নতা কর্মী।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্বাধীনতাস্তম্ভ বেদির নিচে ভূগর্ভে নির্মিত হয়েছে জাদুঘরটি। ওপর থেকে নিচে প্রসারিত হয়েছে জাদুঘরের প্রবেশপথ। জাদুঘরে প্রবেশ করে যে হলঘর চোখে পড়বে তাতে মিলবে অসংখ্য ছবি। ছবিগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। দেয়ালে সাজানো বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিল, বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষর করা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রসহ অসংখ্য আলোকচিত্র। একটি ব্ল্যাক জোন রয়েছে তাতে। তার পাশেই একটি জলধারা। এই জলধারা যেন একাত্তরে সন্তান হারানো মায়ের কান্নার প্রতীক। এর পর রয়েছে নিয়াজীর আত্মসমর্পণের দলিলের অনুলিপি। শেষ অংশে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার ছবি।

কথা হয় দর্শনার্থী ইয়াসমিন আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, এটা খুব ভালো উদ্যেগ। নতুন প্রজন্ম এই স্বাধীনতা জাদুঘরে এসে দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এখানে ইতিহাসের পাশাপাশি আলোকচিত্রও রয়েছে, যা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানতে আগ্রহী করে তুলবে।

পিডিএসও/মুস্তাফিজ

"