রম্যগল্প

ইঁদুর

প্রকাশ : ২২ মে ২০২০, ১৩:১৪ | আপডেট : ২২ মে ২০২০, ১৪:১১

সোহেল নওরোজ

ইঁদুর নিয়ে আমার বেশি এলার্জি নেই। ইঁদুর দেখলেই ‘ও মা গো’ বলে চিৎকার দিই না। ইঁদুরের চেয়ে নোংরা এবং ক্ষতিকর আরও অনেক প্রাণীই চোখের সামনে ঘুরঘুর করে। তাদেরকে যখন প্রশ্রয় দিচ্ছি তখন ইঁদুর আর কোন নস্যি! তথাপি শুধু তিনটে কারণে এই জাতের প্রতি মাঝেমধ্যে বিরক্তি আসে।

এক. প্রয়োজনের চেয়ে এরা একটু বেশি জোরে দৌড়ায়। সর্বদাই যেন দৌড় প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকে। ছোট মাথায় এত চিন্তা কিসের? দুই. খাবার-দাবার খাবি ভালো কথা, বইপত্র কাটবি কেন? বিদ্যার ওপর এত রাগ কেন বাছা? তিন. এরা ঠিকমতো মরতেও জানে না। ঘরের কোনাকানচিতে গিয়ে মরে। মরার পর সাংঘাতিক গন্ধ হয়। মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া আরও কষ্টকর হয়ে যায়।

বাসায় তেলাপোকা থাকবে, ছারপোকা থাকবে, ইঁদুর-ছুঁচো থাকবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মানুষের বাসাবাড়িকে এরা নিজের বাড়ি বলে মনে করে। জন্ম থেকে তেমনটাই দেখে আসছে। জান দেব তবু ঘর ছাড়ব না—এমন ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

সবকিছুর মাত্রা আছে। কিছুদিন যাবৎ আমার বাসায় ইঁদুর তার মাত্রা অতিক্রম করেছে। রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসলেই ইঁদুরের ডিউটি শুরু হয়। এটা ফেলছে, ওটাতে মুখ দিচ্ছে, ক্যাঁচকুচ করছে। কয়েকদিন মুখ বুঝে সহ্য করলাম। অবশ্য মুখে কিছু বললেও লাভ হতো না, ইঁদুর তো আর মুখের ভাষা বোঝে না!

দেয়ালে পিঠ ঠেকলে বাঙালি জেগে ওঠে। ইঁদুরের উৎপাত চরমে পৌঁছানোর পর নড়েচড়ে বসলাম। এর পেছনে ইঁদুরের চেয়ে গিন্নির বকবকানির ভূমিকাও কম নয়। কথা দিলাম, ইঁদুরের একদিন কী আমার একদিন! বাড়িতে হয় ইঁদুর থাকবে, না হয় আমি থাকব। শুরু হলো ইঁদুর দমনের যজ্ঞ।

সমস্যা আর ইউটিউব একই দড়িতে বাঁধা। যেকোনো সমস্যার সমাধান খোঁজা শুরু হয় ইউটিউব থেকে। আমিও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইউটিউবে ব্যয় করলাম। বিষ ছাড়া ইঁদুর তাড়ানোর অনেকগুলো পদ্ধতি পেয়ে গেলাম। ইঁদুরের চিন্তা মাথা থেকে অনেকটাই সরে গেল। এরা এত ভীত প্রাণী, সামান্য পেঁয়াজের গন্ধ, গোলমরিচের ঝাঁঝ, তেজপাতার তেজ সহ্য করতে পারে না! গিন্নিকে বললাম এবার দেখবে মজা। তোমার তেলে ইঁদুর ভাজব। মানে রান্নাঘরের জিনিস দিয়েই ইঁদুর নির্মূল করব।

অলিতে-গলিতে, কানাঘুপচিতে, জানালার ভেতরে-বাইরে গোলমরিচ, তেজপাতা ছেঁটাতে লাগলাম। চার ফালি করে পেঁয়াজ কেটে ফেলে রাখলাম সারা বাসায়। বাইরে থেকে কেউ হঠাৎ ঢুকলে ভাববে হয়তো বিরিয়ানি রান্না হচ্ছে। ভাগ্যিস করোনার সময় কেউ কারো বাসায় যাচ্ছে না। আমাকেও কঠিন জবাবদিহির সামনে পড়তে হচ্ছে না।

আমি নিশ্চিন্ত মনে ইঁদুর-বিষয়ক গল্প পড়তে লাগলাম। ইঁদুর নিয়ে কত কাহিনিকেচ্ছা। অথচ সামান্য মশলাপাতিতে এরা ভ্যানিশ হয়ে যাবে ভেবে পুলক বোধ করলাম। হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা বেচারার জন্য কিঞ্চিৎ মায়া হলো। তার সময়ে ইউটিউব থাকলে আর বাঁশি বাজাতে হতো না।

রান্নাঘর শব্দের জায়গা। নানান রকম শব্দ উৎপত্তি হয়ে কানে আসে। কাজেই টুংটাং শব্দ পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলাম না। সকালে ব্রাশ মুখে ভরে ফুরফুরে মনে রান্নাঘরে উঁকি দিলাম। দেখি জানালার সামনে বসে একটা ধেড়ে ইঁদুর চোখাচোখি করছে। আমার মুখ হা হয়ে গেল, মুখের ভেতর থেকে পেস্টের ফেনাসহ ব্রাশ পড়ে গেল তবু ইঁদুর নড়ল না। ঘরে এসে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। কী ভেবেছিলাম, আর কী হলো! মড়ার ওপর খাড়া ঘা দেবেই। গিন্নি এসে ঝাঁঝিয়ে বলল, কিছু পোলাও চাল আর কয়েক পিচ মাংসও রেখে দিতে। ইঁদুরগুলো পুরো বিরিয়ানির স্বাদ পেত!


গিন্নি বলল, চিল্লায়ো না। ইঁদুর কেবল তোমার দুরবস্থার কথা ভেবে ছুটি নিয়েছে। চুপচাপ থাকো। 
টেলিভিশন খুলে বসলাম। আমার মাথায় তখনো মানুষের বদলে ইঁদুর কিলবিল করছে...


অপমান হজম করার মানুষ আমি না। তড়িঘড়ি বাজারে ছুটলাম ইঁদুর খতমের বিষ আনার জন্য। লকডাউনের জন্য বেশিরভাগ দোকান বন্ধ। কিছু দোকানের শাটার সামান্য খোলা। আমি সেই স্বল্প ফাঁকা দিয়ে মাথা চালিয়ে ইঁদুর মারার বিষের সন্ধান করতে লাগলাম। আমার এহেন কার্যকলাপে দোকানদারগণ অতিশয় বিরক্ত হলেন। এই দুর্যোগে মানুষই বাঁচছে না, ইঁদুর মেরে হবেটা কী? তাদের চোখের ভাষার আগুন হজম করে নিঃস্ব হাতে বাড়ির পথ ধরব এমন সময় রাস্তার ধারে এক হকারের দিকে চোখ পড়ল। ওপরঅলা গাঙ শুকানোর আগেই এই অভাগার দিকে কৃপার দৃষ্টি দিয়েছেন। লোকটা ইঁদুর-তেলাপোকা মারার বিষ বেচে বেড়াচ্ছে। আমি দৌঁড়ে গিয়ে তাকে ধরলাম। করোনার সময় না হলে হয়তো খুশিতে কোলাকুলি করে ফেলতাম। আমাকে দেখে লোকটা একটু বেশিই খুশি হলো। বোঝাই যাচ্ছে, করোনার কারণে তার ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে।

লোকটা তার ওষুধের গুণাগুণ বয়ান করতে লাগল। আমি চৌরাসিয়ার বাঁশির সুরের মতো মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগলাম। আমার কাছে জানতে চাইলেন, তাড়াবেন না মারবেন?
বুঝে উঠতে সময় লাগল। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে জানতে চাইলাম, কোনটা ভালো হবে?
লোকটা তার হলুদেটে দাঁত বের করে জানাল, সবাই তাড়াতে চায়। সামান্য প্রাণী মেরে কী লাভ!
লাভ-লোকসানের হিসেব করার সময় আমার নেই। আমার চাই ডাইরেক্ট অ্যাকশন। খাবে যেখানে লাশ পড়বে সেখানে।
তার স্টকে থাকা সব বিষ কিনে নিলাম। সুযোগ বুঝে দশ টাকার জিনিস বিশ টাকা নিল। তা নিক। কাজ হলেই হলো। বিষ নিয়ে শিস দিতে দিতে চলে আসব সে সময় লোকটা ডাক দিল, বলছিলাম কী তিন শিশি এই ওষুধ নিয়ে যান। আপনাকে একশ টাকায় দেব। বোতলের মুখ খুলে রাখবেন। এক বছরের ভেতর ইঁদুরের লেজও দেখবেন না। বোতলের গায়ে সিল দেওয়া আছে। সেখানে আমার নাম-ঠিকানা সব লেখা আছে। এক-দুইদিন না, আমাদের ত্রিশ বছরের ব্যবসা। বিফলে মূল্য ফেরত। একটা ফোন দিলেই টাকা পাঠিয়ে দেব।

বিশ্বাসের চেয়ে বড় সম্বল আর হয় না। আমি লোকটার সামনে বোতলের লেবেল ছিঁড়ে ফেললাম। তিনি তুষ্ট হয়ে আবার হলুদ দাঁতের হাসি দিলেন।

বাসায় এসে যৌথ অভিযানের মতো তোড়জোড় শুরু করে দিলাম। ডাবল অ্যাকশানে যাব। দুই ওষুধ এক সাথে ফিট করব। পালাবি কোথায়?

প্রথমে বোতল অভিযান। বোতলের মুখ খুলতেই পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টেপাল্টে যেতে লাগল। বিকট-বিশ্রী গন্ধ। তবু সহ্য করে গেলাম। তিন জানালায় সেট করে দিলাম। বিষ ছড়িয়ে দিলাম কোণায় কোণায়। ঘরে এসে হাতে-পায়ে-শরীরে সুগন্ধি মাখলাম। তবু গন্ধ যায় না। স্বস্তি পেলাম এই ভেবে, এতদিনে কাজের মতো কাজ হলো। এবার বুঝবে ঠ্যালা। ইঁদুরের প্রতি দয়া দেখিয়েই ভুল করেছি, মাথায় উঠে বসেছে।

ঘন দুধ আর কড়া পাতি দিয়ে চা বানিয়ে মোবাইলে রবীন্দ্রসংগীত চালিয়ে দিলাম। আহা, কবিগুরুও করোনার কথা ভেবেছিলেন সেই কবে। আজি ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করে গেছেন কি সাধে? চায়ে চুমুক দিয়ে কবিগুরুর বিরল সৃষ্টি নিয়ে ভাবছিলাম। গিন্নি ভাবনায় বিঘ্ন ঘটাল, এই এসো দেখে যাও, দেখে যাও।
দেখার কী আছে! ইঁদুর মরে বুঁদ হয়ে আছে সে তো বোঝাই যাচ্ছে।
আমি গলা ছাড়লাম, তুলে ফেলে দাও।
গিন্নি ভলিউম বাড়িয়ে বলল, আরে বলছি তাড়িতাড়ি আসো।
গিন্নির কথার বিপরীতে ধীরে ধীরে পা ফেলে রান্নাঘরে ঢুকলাম, কই কী হয়েছে?
গিন্নি বলল, জানালায় দেখো।

নিজের চোখে জীবনে অনেক আশ্চর্য জিনিস দেখেছি। এর মতো আশ্চর্যজনক দৃশ্য খুব কমই চোখে পড়েছে। ইঁদুর বাবাজি মুখখোলা শিশির ওপর বসে ইতিউতি করছে।
আমি ধপাস করে রান্নাঘরে বসে পড়লাম।
গিন্নির কণ্ঠে শ্লেষ, এবার কী করবা? তোমার সব ওস্তাদি তো মাইর খেয়ে গেল।

কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ ঝিম ধরে বসে ভাবতে লাগলাম, মানুষের জীবন কি ইঁদুরের চেয়েও ঠুনকো? এত চেষ্টা-তদবির করেও ইঁদুর মরছে না, আর সামান্য করোনা ভাইরাসে লাখ লাখ লোক মরে যাচ্ছে। কেউ কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। আহারে মানুষ, ইঁদুরের সাথেও পারলি না।

ব্যাগে প্রয়োজনীয় কয়েকটা কাপড়, মোবাইলের চার্জার, হেডফোন, পানির বোতল ঢুকিয়ে রাখলাম। আমি এক কথার মানুষ। ইঁদুর যখন এ বাড়ি ছেড়ে যাবে না, তখর আমাকেই পথ দেখতে হবে।
গিন্নি এসে একপ্রস্থ শাসিয়ে গেল, তুমি পাগল হয়ে গেলে নাকি! ইঁদুরের জন্য তুমি বাড়ি ছাড়বে কেন?
আমি সিদ্ধান্তে অটল। ইঁদুরের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকব না। দরকার হলে রাস্তায় গিয়ে শুয়ে থাকব তাও ভালো।
সন্ধ্যার পরে বাইরে বের হলে পুলিশের প্যাদানি খাওয়ার ভয় আছে। রাতটা তাই বিশেষ বিবেচনায় থেকে গেলাম।
ভোরবেলা গিন্নি চা নিয়ে হাজির। হয়তো এটাই তার হাতে খাওয়া আমার শেষ চা!
তৃপ্তি নিয়ে চা খেলাম।
গিন্নি রহস্যভরে বলল, আমার মনে হয় তোমার প্রতি ইঁদুরের দয়া হয়েছে। সকালে একটা ইঁদুরও চোখে পড়েনি। জিনিসপত্রও সব ঠিক জায়গায় আছে।

ইঁদুর জাতের ওপর বিশ্বাস অনেক আগেই উঠে গেছে। তবু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য দুটো দিন থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
সত্যি বলছি, এই দুই দিনে ইঁদুরের ছায়াও চোখে পড়েনি। না আমার, না গিন্নির।
সাহস পেলে বাঙালি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আমিও নানানভাবে নিজের কৃতিত্ব জাহির করতে লাগলাম।
গিন্নি থামিয়ে দিয়ে বলল, চিল্লায়ো না। ইঁদুর কেবল তোমার দুরবস্থার কথা ভেবে ছুটি নিয়েছে। চুপচাপ থাকো।

টেলিভিশন খুলে বসলাম। আমার মাথায় তখনো মানুষের বদলে ইঁদুর কিলবিল করছে। টিভির স্ক্রলে লেখা ভাসছে। আমি পড়ছি—করোনায় আক্রান্ত্র হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৫ হাজার ২২৪, যুক্তরাজ্যে ২ হাজার ৭০৯, ইতালিতে ৩ হাজার ৫২২ এবং বাংলাদেশে ২৬ ইঁদুর মারা গেছে...

পিডিএসও/হেলাল