জীবন দর্শনের সীমাহীন মানবপ্রীতি : বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রকাশ : ০৭ মে ২০২০, ১৩:২১

আরমান হোসাইন

আজ ২৫ বৈশাখ। এই দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মানব জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নাই, এমন কোন চিন্তা নেই, এমন কোনো ভাব নেই, যেখানে তিনি বিচরণ করেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতায়, গানে, প্রবন্ধ-গল্পে, উপন্যাসে মৃত্যুঞ্জয়ী ও চিরবিস্ময়। সাহিত্য, শিল্পকলা, ধর্ম, শিক্ষা, সমাজ সংস্কার, রাজনীতি, দর্শনকিছুই তাঁর চিন্তার বিষয় থেকে বাদ যায়নি। তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, শিল্পী ও শিক্ষাবিদ। তিনি এক হাজারের মতো কবিতা ও দুই হাজারের বেশি গান রচনা করেছেন এবং অন্তত তিন হাজার ছবিও এঁকেছেন।

রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি প্রেম বিশাল। কবির দৃষ্টিতে প্রকৃতি নিছকই মানুষের উপভোগ বা রসাস্বাদনের বিষয় নয়। তিনি প্রকৃতির কোলে মাথা রেখে শুনেছিলেন জননী বসুন্ধরার অমোঘ প্রেম। এত বিশাল ছিল রবি ঠাকুরের উপলব্ধি। এত গভীর ছিল তাঁর প্রকৃতি প্রেম।

তার প্রেম সাধনায় ঈশ্বর প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, স্বদেশ প্রেম বা মানব প্রেম এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। প্রেমের আনন্দ তাঁর দৃষ্টিতে সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে লীলাময়ের রসবৈচিত্র্য আস্বাদনের আনন্দ। তাঁর নিজের উপলব্ধি

‘আমার মধ্যে আমার অন্তর্দেবতার একটি প্রকাশের আনন্দ রহিয়াছে। সেই আনন্দ, সেই প্রেম, আমার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, আমার বুদ্ধি-মন, আমার নিকট প্রত্যক্ষ এই বিশ্বজগৎ, আমার অনাদী, অতীত ও অনন্ত ভবিষ্যৎ আপ্লুত করিয়া আছে। এ লীলা তো আমি কিছুই বুঝি না, কিন্তু আমার মধ্যেই নিয়ত এই এক প্রেমের লীলা।’

রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিজাত কবি। কবিতা তার প্রাণ ও মান। মনের সব কথা বলা শক্ত। কিন্তু কবিতার ভাষায় বহু কঠিন কথা, ন্যায়নীতির কথা, মূল্যবোধের কথা তির্যকভাবে বলতে পেরেছেন। তাঁর এসব বক্তব্যে সমাজকে জাগিয়ে তোলার প্রয়াস লক্ষণীয়। অন্যায়-অবিচার, দুঃশাসনএসব অবলোকন করে কবি সেই অন্যায়ের মূলে আঘাত হানার আহ্বান রাখছেন। ‘কড়ি ও কোমল’ (১৮৮৬) কাব্যের ‘প্রাণ’ কবিতায় কবি ব্যক্ত করেছেন অসীম জীবনপ্রীতি

‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই,
এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে
জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই।’

কবির বোধের কাছে পৃথিবী সুন্দর, পৃথিবীর মানুষ সুন্দর; কাজেই এই সুন্দর মানুষ-ভুবন ছেড়ে যেতে চান না। মানুষের কাছে তিনি চিরজীবী হতে চান। এ কাব্যের মঙ্গলসংগীত শীর্ষক কবিতায় অহংকার ত্যাগ করার বাসনা ব্যক্ত করেছেন, আরও বাসনা করেছেন হিংসা-দ্বেষ ত্যাগ করার।

মাটির মানুষ আর স্রষ্টাকে রবীন্দ্রনাথ এক বিশেষ মূল্যবোধ দ্বারা নির্মাণ করেছেন। তাঁর কাছে মানবজীবন শাশ্বত মূল্যবোধ দ্বারা উচ্চকিত। তাঁর জীবন দর্শনে রয়েছে সীমাহীন মানবপ্রীতি। কবি শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ ও বাংলার চিরবঞ্চিত সংগ্রামশীল কৃষককে দেখেছিলেন অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। বস্তুত খেটে খাওয়া মানুষের সারল্য, সত্যনিষ্ঠা, মহানুভবতা ও কর্তব্যপরায়ণতার মতো মানবিক গুণাবলি কবিকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট ও অভিভূত করেছিল।

রবীন্দ্রনাথ জীবনব্যাপী মানুষের কল্যাণ চিন্তায় রত ছিলেন। মানুষের মঙ্গলই ছিল তাঁর জীবন চিন্তার মৌল দিক। তিনি কল্পনাশক্তি ও জীবনের সমুদয় উষ্ণতা দিয়ে মানুষকে ভালোবাসতেন। তাঁর কাছে সবচেয়ে কড় কথা ছিল মানুষের আত্মশক্তি। এ বিষয়ে তিনি ঐতিহ্য হিসেবে উপনিষদ ও গৌতম বুদ্ধ যা বলে গেছেন সেই সব বাণীর প্রতিধ্বনি করেছেন কিন্তু ওইসব চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করেছেন ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা, উচ্ছ্বাস ও মাঙ্গলিক চিন্তাকে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কালজয়ী সাধনা দ্বারা জীবনের অন্তর্নিহিত রহস্যের সন্ধান লাভ করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর সাধনার পরিধি সীমার মাঝে অসীম। সীমার মধ্যেই অসীমতা। তাঁর ৮০ বছরের জীবনব্যাপী মানবজীবনের অসীমতার সন্ধান করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন এই মেঘ একদিন কেটে যাবে এবং বিশ্বময় শান্তির সুবাতাস বইবে—তখন এই বিশ্বটিই হবে স্বর্গতুল্য এবং জয় হবে সত্য ও সুন্দরের। জয় হবে বিশ্ব মানবতার।

লেখক : প্রভাষক, উইন্স কলেজ, রংপুর

পিডিএসও/হেলাল

সর্বাধিক পঠিত