আজ এই হেমন্তের জলজ বাতাসে

প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৫৮ | আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৪১

মৃধা আলাউদ্দিন
অলংকরণ : হায়দার আহমেদ

ঋতুবৈচিত্র্যময় আমাদের এই বাংলাদেশে কার্তিক-অগ্রহায়ণ নিয়ে হেমন্তকাল। হেমন্তে থাকে শিশিরসিক্ত, কুয়াশাচ্ছন্ন মিষ্টি রোদের সুন্দর সকাল। শিউলি, কামিনী, গন্ধরাজ, মল্লিকা, দেবকাঞ্চন, হিমঝুরি, রাজঅশোক ইত্যাদি ফুল আমাদের মাতিয়ে তোলে। হেমন্তে বিভিন্ন ফলেরও সমারোহ ঘটে। অনেক ফলের মধ্যে কামরাঙা ও চালতা আমাদের প্রিয় দুটি ফল। নারিকেল এ ঋতুর প্রধান ফল, যা খুবই সুস্বাদু বা সব কাজের কাজি; সবার প্রিয়। কবি ফররুখ আহমদ বলেন, ‘চমকে ওঠে তাল সুপারি নারকেল গাছ।’ গৃহিণীর পিঠার তালিকায় থাকে নারিকেলের তৈরি রকমারি মুখরোচক খাবার। মহিলারা সারা রাত জেগে পিঠা তৈরি করেন, আর সে কষ্ট আনন্দময় হয়ে ওঠে সকালে তা নিজেরা খেয়ে এবং পড়শিদের দিয়ে। খুব সুন্দর দুধেল জোছনার মতো মনে হয় হেমন্তের সকালের প্রকৃতিকে।

হেমন্তের সকালে শিউলির সৌরভ বাঙালির প্রাণে আনে মিষ্টি-মধুময় উৎসবের আমেজ। হাসিতে প্রাণোজ্জ্বল থাকে সবার প্রাণ। আনন্দে ভরা জোছনাপ্লাবিত পূর্ণিমা রাত। পাতাঝরা বৃক্ষের রূপবৈচিত্র্য। আর এ জন্যই যুগ যুগ ধরে কবিরা হেমন্তকে তুলে এনেছেন তাদের কবিতায়। বৈষ্ণব পদাবলি থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্‌দীন, জীবনানন্দ দাশ, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, নির্মলেন্দু গুণ, মোহাম্মদ নূরুল হুদা, মহাদেব সাহা প্রমুখ কবিদের কবিতায় হেমন্ত এসেছে প্রচণ্ড ভালোবাসার শুভ্র-শুদ্ধতায়।

আমরা ছেলেবেলায়, আমাদের গ্রামে দেখেছি—প্রকৃতির নিয়মেই হেমন্ত নিয়ে আসে হিম হিম মৃদুমন্দ বাতাসসহ কুয়াশা। চারদিকে নতুন ধানের মিষ্টি গন্ধ। সঙ্গে শীতের আগমনী বার্তা। কৃষিনির্ভর জনজীবনে হেমন্ত সৃষ্টির আনন্দ-উল্লাস আমাদের এই দেশে কবিতার মতোই ভেসে ওঠে। অভাব-অনটনের শেষে কার্তিক মাসে উঠে আসে সমৃদ্ধির সোনালি আভাস। কৃষকের মুখে ফোটে অনাবিল হাসি। ধান কাটা-মাড়াইয়ের শেষে থাকে পরিতৃপ্তির শুভ্র ব্যস্ততা। চলতে থাকে নবান্নের পিঠা-পায়েসের আয়োজন। সেসব উৎসব ধ্বনিত হয় কবির হৃদয়ের আত্মোপলব্ধিতে।

শুধু হেমন্ত নয়; সব ঋতু নিয়েই এ দেশের কবি-সাহিত্যিকরা পেয়ে থাকেন কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা। কবিরা আমাদের এই বৈচিত্র্যময় ঋতুকে তুলে ধরেন মধুময় কাব্য-অলঙ্কারে, সুন্দর-সাবলীল সাহিত্যে। প্রায় সব কালের, সব কবির রচনায় কোনো না কোনোভাবে হেমন্তের প্রসঙ্গ এসেছে। ঋতুর প্রসঙ্গ এসেছে—উপমা, রূপক, উৎপেক্ষা ও অলঙ্কারে। হেমন্ত ঋতু অনবদ্য ও নান্দনিকতায় বাংলা কাব্য সম্ভারকে বিশাল বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপস্থিত করেছে। নদী, নারী ও হেমন্তের উদাসীন-উৎফুল্ল প্রকৃতি বারবার উঠে এসেছে আমাদের বাংলা কাব্য ও চিত্রকলায়। চিত্রকল্প-উপমা-বিষয়ে সেসব কবিতা-চিত্রকলা হয়েছে অনন্য। অনবদ্ধ।

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগে বৌদ্ধ সহজিয়াগণের ‘চর্যাপদে’ বিশেষ কোনো ঋতুর উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। শুধু কাউন বা চিনা পাকার মাস অর্থাৎ শীতকালের উল্লেখ রয়েছে কোথাও কোথাও। তবে মধ্যযুগের কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর লেখা ‘কালকেতু’ উপাখ্যানে হেমন্তের সামান্য নমুনা পাওয়া যায়। কবি বলেন, ‘কার্তিক মাসেতে হয় হিমের প্রকাশ/যগজনে করে শীত নিবারণ বাস’।

সব ঋতু নিয়েই এ দেশের কবি-সাহিত্যিকরা পেয়ে থাকেন কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা। কবিরা আমাদের এই বৈচিত্র্যময় ঋতুকে তুলে ধরেন মধুময় কাব্য-অলঙ্কারে, সুন্দর-সাবলীল সাহিত্যে। প্রায় সব কালের, সব কবির রচনায় কোনো না কোনোভাবে হেমন্তের প্রসঙ্গ এসেছে

আজকের এই আধুনিক সময়ে এসে বাংলা সাহিত্য নানা শাখা বিস্তার করলেও কবিতা আগের মতোই সমুজ্জ্বল-সুন্দর হয়ে আমাদের চারদিক ম ম ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। ঋতুচক্রের এ আবাহন আধুনিক কবিদেরও নাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যের গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হেমন্ত নিয়ে অজস্র কবিতা লিখেছেন। কবি লিখেছেন, ‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে/জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে/শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার/রয়েছে পড়িয়ে শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার/স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।’ অঘ্রাণের সওগাত কবিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রকাশ হেমন্তের বাস্তব একটি চিত্র। নবান্ন উৎসবে গ্রাম্য-জীবন সংসারে কীভাবে হাসি-উচ্ছ্বলতা প্রকাশ পায় নজরুল তা কবিতায় তুলে ধরেছেন। কবি বলেন, ‘কাঙালিনী ধরা-মা’-এর আদিকালের কত অনন্ত বেদনা/হেমন্তের এমনি সন্ধ্যায় যুগ যুগ ধরি বুঝি হারায় চেতনা। অথবা তুমি শুনেছিল বন্ধু পাতাঝরা গান/ফুলে ফুলে হেমন্তের বিদায়-আহ্বান।’

পল্লীকবি জসীমউদ্‌দীনও পিছিয়ে নেই এই যাত্রায়। তার পদবির সঙ্গেই মিশে আছে গ্রামীণ জনজীবনের রঙ, রূপ ও রস। তার কবিতায়ও হেমন্ত এসেছে—‘আশ্বিন গেল কার্তিক মাসে পাকিল ক্ষেতের ধান,/সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি কোটার গান।/ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়ায় বায়ু/কলমি লতায় দোলন লেগেছে, ফুরাল ফুলের আয়ু।’ কাজী নজরুল ইসলাম ও পল্লীকবির মতোই হেমন্তের এসব বৈশিষ্ট্য নাড়া দিয়েছে জীবনানন্দ দাশকেও। তিনি লিখেছেন, ‘এদেহ অলস মেয়ে/পুরুষের সোহাগে অবশ/চুমে লয় রৌদ্রের রস/হেমন্ত বৈকালে/উড়ো পাখপাখালির পালে/উঠানের পেতে থাকে কান, শোনে ঝরা শিশিরের ঘ্রাণ/অঘ্রাণের মাঝরাতে।’ গ্রামবাংলার অনবদ্য রূপ বিমুগ্ধ করেছে সুফিয়া কামালকে। তাই তো গ্রামীণ প্রকৃতির সহজ-সরল ও স্বাভাবিক রূপ তার কাব্যেও উপজীব্য হয়ে উঠেছে। তিনি লিখেছেন, ‘হেমন্তের কবি আমি, হিমাচ্ছন্ন ধূসর সন্ধ্যায়/গৈরিক উত্তরীয় টানি মিশাইয়া রহি কুয়াশায়।’

শামসুর রাহমানের হেমন্তের পঙক্তিমালায় দেখা যায়, ‘যে আমাকে ভালোবাসে তাকে কাঁদিয়ে/বারবার পড়িয়ে নিজের চোখ অশ্রুহীন আমি;/কীভাবে সারাবো ক্ষত? কী করে ঝরাবো/অব্যর্থ শিশির আর্ত হেমন্তের পীড়িত শরীরে?’ গ্রামবাংলার জীবন ও শ্যামল রূপ আল মাহমুদের কবিতায় দারুণভাবে ফুটে ওঠেছে। তবে তার কাব্যে প্রেম, প্রকৃতি, সৌন্দর্য ও নারী অভিন্ন সত্তায় একাকার হয়ে আছে। কবি বলেন, ‘আজ এই হেমন্তের জলজ বাতাসে/আমার হৃদয় মন মানুষীর গন্ধে ভরে গেছে/রমণীর প্রেম আর লবণসৌরভে/আমার অহংবোধ ব্যর্থ আত্মতুষ্টির ওপর/বসায় মার্চের দাগ, লাল কালো/কট ও কষায়।’ আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রায়ই বাংলা কবিতার ঐতিহ্যে ছেড়ে ইউরোপীয় কাব্যরীতির প্রতি আকৃষ্ট হতেন। তার জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ পাঠ করলে এ কথাই আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়। বিশেষত, শিল্পের জন্য শিল্প এমন চেতনা তাকে আচ্ছন্ন করেছিল। ফলে তিনি নির্বিঘ্নে অবগাহন করেছেন পরাবাস্তবতার জগতে। হেমন্ত নিয়ে তার কবিতাতেও আমরা পরাবাস্তবতা খুঁজে পাই। তিনি বলেন, ‘চোখের সবুজ প্রিজমের ভেতর থেকে লাফিয়ে পড়েছে ফড়িং/হেমন্তের শিশিরের সুঁই ঘিরে ধরেছে তার পদযুগল/কোনো আদিম দেবতার কাছে নতজানু/ধূসর মানুষের মতো...।’ নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় অনেকটা অভিশাপ নিয়েই এসেছে হেমন্ত। তিনি তার কবিতায় বলেন, ‘গাছ ভরে যদি শেফালি ফোটালে/কুড়াতে কেনো সময় দিলে না?/এই অভিযোগে, এই অভিশাপে/চিরকাল হবে হেমন্ত দণ্ডিত।’ প্রায় সবার কবিতাতেই হেমন্তের পাতাঝরার গান শুনতে পাওয়া যায়। প্রকৃতির অপার বিস্ময় ধরা পড়ে কবিদের কবিতায়।

হেমন্তের মাঠ থেকে কৃষকরা ঘরে তোলে নতুন ফসল। বক, শালিক, বালিহাঁস ও পানকৌড়ি নামে ডাঙ্গায় পড়ে থাকা ছোট মাছ এবং ক্ষেতের ধান খুটে খুটে খাওয়ার লোভে। রাখাল বালকেরা গরু-মহিষের পাল ছেড়ে দিয়ে মেতে ওঠে ডাঙগুলি-গোল্লাছুট ও দাড়িয়াবাধা খেলায়। সমস্ত মাঠ ছাপিয়ে সোনার ধানের আভা শেষ বিকেলে পশ্চিম আকাশকে পর্যন্ত রাঙিয়ে দেয়। হেমন্তের এই সুন্দর সৌন্দর্যে মানুষের মন ভরে ওঠে অজস্র আনন্দধারায়।

হেমন্তের সকালে শিউলির সৌরভ আমাদের প্রাণে আনে আনন্দ-উৎসবের আমেজ। ফোটা ফুল যেন আমাদের সৌন্দর্যের অবয়ব ও পবিত্রতার নিত্য প্রতীক! ফুল মানুষের মনে প্রশান্তি আনে। সৃষ্টি করে শান্তির পরিবেশ। হেমন্ত সকালের গরম, ধূমায়িত পিঠা-পায়েসের কথা, শিউলি কুড়ানোর কথা এ জীবন থেকে মুছে ফেলা যাবে না। মুছে ফেলা যাবে না রাতের আকাশের মেঘমুক্ত ফালি ফালি জোছনাসমেত আলো-আঁধারের কথা—জীবনের প্রথম শিউলির কথা।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

[email protected]

পিডিএসও/হেলাল