অভিনন্দন ওলগা

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৪৫ | আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৫২

অনন্ত উজ্জ্বল
সাহিত্যে ২০১৮ সালে ওলগা তোকারজুক নোবেল জিতেছেন

২০১৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া লেখক ওলগা তোকারজুক বর্তমানে পোল্যান্ডের সব থেকে আলোচিত এবং প্রশংসিত লেখক। পোল্যান্ডের অতীত কিছু ঘটনাপ্রবাহ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট করে আনায় সে দেশের রক্ষণশীল শাসকগোষ্ঠী তাকে কঠোর সমালোচনা করেছেন। এমনকি হত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। তিনি উপন্যাসের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করেছেন। ৫৭ বছর বয়সি এই লেখক পোলিশ সরকারের কড়া সমালোচক, বামপন্থি অধিকারকর্মী ও বুদ্ধিজীবী। নিঃসন্দেহ ওলগা তোকারজুকের নোবেল বিজয় বর্তমান সময়ের জন্য একটি বিশেষ ঘটনা। পোল্যান্ডের উদারপন্থি বুদ্ধিজীবী এবং সচেতন পাঠকশ্রেণি বলেছে, ‘রয়েল সুইডিশ একাডেমি লেখায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিবেচনা করে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে ২০১৮ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এটা ছিল সময়ের দাবি।’

ওলগা তোকারজুক অসাধারণ রসবোধ, কল্পনাশক্তি ও আত্মবিশ্বাসের অধিকারী লেখক। তিনি লেখালেখির মাধ্যমে পোল্যান্ডের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার অসামান্য ‘বর্ণনাত্মক কল্পভাষ্য’ কথা বলে সবিস্তারে, বর্ণনা করে সব কিছু, তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছুটে চলে আরো কিছু বলার জন্য। সেই গল্পে মূর্ত হয়ে আসে মানবজীবনের সীমানা ভাঙার গল্পগুলো। পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন জাতীয়তাবাদী সরকারের মতামত উপেক্ষা করে দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্ধকার দিক নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে বিতর্কে জড়িয়েছেন ওলগা তোকারজুক।

ওলগা ১৯৯৮ সালে তার উপন্যাস ‘হাউস অব ডে, হাউস অব নাইট’ ইংরেজি ভাষায় প্রথম প্রকাশ করেন। বিশ্বভাষা ইংরেজিতে উপন্যাসটি প্রকাশের পরপরই পাঠক সমালোচক সবার দৃষ্টিতে আসেন ওলগা তোকারজুক। তবে ‘হাউস অব ডে, হাউস অব নাইট’ উপন্যাসে তার সৃষ্টি করা নিজেস্ব প্রকাশ রীতির কারণে তিনি প্রশংসার চেয়ে ভর্ৎসনা পেয়েছেন অনেক বেশি। তার এ সময়ের লেখার গভীরে প্রবেশ করলে খুঁজে পাওয়া যায়—মানুষের গভীর নৈতিক মূল্যবোধ ও তার দুর্বলতা নিয়ে বিশ্লেষণ।

ওলগা তোকারজুক কৈশোর বয়স থেকে কবিতা লেখা শুরু করেন। তারপর অনেক বছর তিনি আর লেখালেখি করেননি। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৩ সালে জীবনের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জার্নি অব দ্য বুক-পিপুল’ প্রকাশিত হয় এবং সমালোচক ও পাঠকের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন। এই উপন্যাসের রেশ ধরে আরো চারটি উপন্যাস তিনি রচনা করেন, যেগুলো আগের মতোই প্রশংসিত হয় সমালোচকদের কাছে। ওলগা তোকারজুক দক্ষ উপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিতি পান এ সময় থেকে। তিনি ভ্রোসওয়াভ আন্তর্জাতিক ছোটগল্প উৎসবের উল্লেখযোগ্য একজন বিচারক।

ওলগা তোকারজুক সব সময় চেষ্টা করেন আগের থেকে নতুন কিছু করতে, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে যা লিখে ফেলেছি তাকে সৃজনশীলতা মনে করি না। আমি বিশ্বাস করি, নতুন নতুন বিষয় ও রীতি নিয়ে কাজ করতে

তিন দশক ধরে ওলগা তোকারজুক তার দেশের পাঠকের কাছে তুমুল জনপ্রিয় একজন লেখক। এ পর্যন্ত তার তিনটি উপন্যাস পোলিশ ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে প্রকাশিত ফ্লাইট উপন্যাসের জন্য তিনি ২০১৮ সালে ম্যান বুকার পুরস্কার অর্জন করেন। যদিও ফ্লাইট উপন্যাসটি ২০০৭ সালে প্রথম পোল্যান্ডে পোলিশ ভাষায় প্রকাশিত হয়। ওলগা তোকার্তুক নিজের এই উপন্যাস সম্পর্কে বলেছেন, ‘ফ্লাইট আদৌ কোনো উপন্যাস নয় বরং এটা অনেক বেশি রাজনৈতিক এবং ভাষাতত্ত্ব নির্ভর।’

উল্লেখ্য, ওলগা তোকারজুক প্রথম পোলিশ ঔপন্যাসিক হিসেবে ম্যান বুকার পুরস্কার জয়ের গৌরব অর্জন করেছেন। এই উপন্যাস প্রসঙ্গে পোল্যান্ডের ক্ষমতাশীলরা বলেছেন, ‘ওলগা তোকারজুকের উপন্যাস জাতীয়তাবিরোধী।’ অথচ তিনি পোল্যান্ডের জাতিগত মিলনের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে এনেছেন তার উপন্যাসে। তার লেখালেখির প্রকৃত বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে মানুষে মানুষে মিলনের গল্প। প্রতিদিন চারপাশে তিনি যা দেখেন তাই তুলে আনেন তার লেখায়। তাইতো আমরা তার ‘ফ্লাইট’ উপন্যাসে দেখতে পাই, তিনি পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন বেলজিয়ামের ১৭ শতকের শহর ফ্লান্ডার্স থেকে ১৮ শতকের ভিয়েনা এবং ১৯ শতকের প্যারিসের সঙ্গে। আলোচনা করেছেন শরীর এবং মনঃসমীক্ষণ নিয়ে।

আবার ঠিক এর উল্টোটি দেখতে পাই কিছুকাল আগে ইংরেজিতে অনূদিত হওয়া ‘ড্রাইভ ইউর প্লাও ওভার দ্য বোনস অব দ্য ডেড’ উপন্যাসে। এই উপন্যাসে ওলগা দেখিয়েছেন—উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ‘ইয়ানিনা দুসেইকো’ চেক রিপাবলিকের কাছাকাছি একটি শহরে বাস করেন এবং তিনি প্রায় আন্তর্জাতিক সীমানা পার হয়ে ঢুকে পড়েন চেক দেশে। এভাবে নিয়মিত তিনি আসা-যাওয়া করেন দুই দেশে। কেন তিনি এই আচরণ করেন? এ প্রসঙ্গে ইয়ানিনা দুসেইকোকে দিয়ে ওলগা বলিয়েছেন, ‘বারবার দেশের সীমানা পার হতে আমার খুব ভালো লাগে। এই বাধাহীন পারাপার আমাকে অনেক আনন্দ দেয়। কারণ একটা সময় ছিল দুই দেশের মধ্যে এভাবে ইচ্ছামতো পারাপার অসম্ভব ছিল।’ অবশ্য ইয়ানিনা দুসেইকোর চারিত্রিক এই বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি তাকে ঔপন্যাসিক ওলগা তোকারজুক উপস্থাপন করেছেন প্রাণীদের মুখপাত্র হিসেবে। লেখক বলেছেন, ‘ইয়ানিনা দুসেইকো সেসব নির্বাক প্রাণীর মুখপাত্র, যাদের ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু সারা জীবন তাদের সেই ব্যথা অনুভবের কথা অব্যক্ত থেকে যায়। কোথাও বলা হয় না।’

এই উপন্যাসটি ভালোভাবে গ্রহণ করেননি পোল্যান্ডের সাহিত্য সমালোচকরা। উপন্যাসকে কেন্দ্র করে সিনেমা নির্মিত হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয় ওলগা তোকার্তুককে। উপন্যাসটি অ্যান্টি ক্রিস্টিয়ানিটি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লেখা বলে মন্তব্য করেন পোল্যান্ডের জাতীয় গণমাধ্যম। আবার উদারপন্থিরা বলেছেন, ‘ওলগা ধর্মীয় অন্ধত্বকে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তার উপন্যাসে।’ এর চূড়ান্ত প্রকাশ পাওয়া যায় ‘দ্য বুকস অব জ্যাকব’ উপন্যাসে। জ্যাকব কীভাবে ইয়াকুব হলো, সেই প্রসঙ্গ আনতে গিয়ে ওলগা লিখেছেন, ‘মূলত ১৮ শতকের পোল্যান্ডের ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক আলেখ্য। সেখানে উপস্থাপিত হয়েছে ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মে বিভিন্ন পর্ব।’ ‘দ্য বুকস অব জ্যাকব’ প্রসঙ্গে ওলগা তোকার্তুক বলেছেন, ‘বইটি ১ লাখ ৭০ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। বইটির ব্যাপক বিক্রি প্রমাণ করে পোল্যান্ডের জনগণ কতটা অতীতের প্রতি স্মৃতিকাতর।’

ওলগা তোকারজুক সব সময় চেষ্টা করেন আগের থেকে নতুন কিছু করতে, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তাই যা হয়ে গেছে তা পেছনে ফেলে তিনি খুঁজে ফেরেন প্রকাশের নতুন কোনো ভাব, ভাষা বা প্রকাশভঙ্গি। এই প্রসঙ্গে ওলগা বলেন, ‘ইতোমধ্যে যা লিখে ফেলেছি তাকে সৃজনশীলতা মনে করি না। আমি বিশ্বাস করি, নতুন নতুন বিষয় ও রীতি নিয়ে কাজ করতে।’

লেখক : কবি ও অনুবাদক

উপপরিচালক, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র

পিডিএসও/হেলাল