পাঠকের অভ্যাসে ‘অনভ্যাসের দিনে’

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:৪২

ইদ্রিস-উর-রহমান

প্রত্যেক মানুষের কিছু কল্পনার জগৎ থাকে। এই জগৎ-সংসারে ক্রমবর্ধমান জঞ্জালের ভেতর মানুষের বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। সদ্য কিশোর থেকে বয়সের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধের মাঝেও তা প্রবাহিত। তার আগে বুঝে নেওয়া যাক, কীভাবে এই জগৎ মানুষের জীবন অর্থবহ করে তুলে।

প্রচণ্ড জ্যামে বসে থাকা মানুষের কল্পনায় ভেসে উঠে, ইস্, এখন যদি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোন ট্যাক্সিতে বসে থাকতাম! কিংবা ট্যাঙিতে বসে থাকা ব্যক্তির কল্পনায় উঁকি দেয়, যদি আজ তার নিজস্ব কপ্টার থাকতো কত দ্রুতই না সে গন্তব্যে পৌঁছে যেত! আবার সেই কপ্টারে বসে থাকা ব্যক্তির কল্পনায় চলে আসে, যদি তার গন্তব্য তার সন্নিকটেই হত! তাহলে লম্বা ক্লান্তিকর ভ্রমণের দরকারই হতো না।

মানুষ বেঁচে থাকাকে আরো উপভোগ্য করে তোলার জন্য নিত্য নতুন প্রেক্ষাপট ও চরিত্র তৈরি করে, যা তাকে বেঁচে থাকার কাল্পনিক আনন্দ দেয়। ছোটগল্প আমাদের জন্য সেই কাজ করে। তবে তা নিছক আনন্দ নয়, চিন্তায় সমৃদ্ধ ও ভাবনায় তাড়িত করে। কথা হচ্ছে অলাত এহ্সানের গল্পসংকলন ‘অনভ্যাসের দিনে’ নিয়ে। লেখকের প্রথম গ্রন্থ এটি। কিন্তু তার লেখাগুলোকে রেখেছেন তত্ত্বের উপনিবেশ মুক্ত; এতে ম্যাজিক রিয়ালিজম আছে কি নেই, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত নন, বরং একটা নিপাট গল্প লেখার দিকেই তার ঝোঁক। তবে কেউ চাইলে নিজের তত্ত্ব চিন্তাকে গুছিয়ে নিতে পারেন। ভাষার ব্যবহার ও চিন্তার বিন্যাস অনেকাংশে লেখককে স্বতন্ত্র করে রেখেছে। তরুণ গল্পকার তিনি, তবে অপরিচিত নন, বরং পরীক্ষিতই বলা যায়। বিভিন্ন লেখনির মাধ্যমে ইতোমধ্যে তিনি সেই অবস্থানটি তৈরি করেছেন। ফেরা যাক কাল্পনিক জগৎ প্রসঙ্গে।


অনভ্যাসের দিনে : অলাত এহ্সান, প্রকাশক : প্রকৃতি, মূল্য : ২২০ টাকা, ভূমিকা : অভিজিৎ মুখার্জি, প্রচ্ছদ : বিপুল শাহ্, আইএসবিএন : ৯৭৮-৯৮৪-৯২০৪৯-৩-০


বই হচ্ছে মানুষের কাল্পনিক চরিত্র তৈরির সহজতম প্রধান উৎস, আর সেই কাহিনি যদি হয় ব্যক্তি চরিত্র নির্ভর, তবে তা আরো সহজগামী হয় পাঠকের জন্য। এহ্সানের প্রত্যেক গল্পের পটভূমি ও চরিত্র ভিন্ন, প্রেক্ষাপটও বিস্তৃত। সেখানে যেকোন চরিত্র নিয়ে পাঠক হারিয়ে যেতে পারেন আপন কল্পজগতে। কথা শুরু করা যাক একেবারে শুরু থেকে। বইয়ের প্রসঙ্গ আসতেই সবার আগে চিত্র মাথায় ঘুরাফেরা করে, তা হচ্ছে প্রচ্ছদ। প্রচলিত সেই প্রবাদের মতো, ‘মানুষের আগে দর্শনধারি, তারপরে বাছবিচারি।’ এটা মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পাঠককূলও এর বাইরে নন। নির্দিষ্ট বিষয় ও লেখক বিবেচনা বাদ দিলে তরুণ, অভিজ্ঞ ও বিজ্ঞ সব পাঠকই নতুন বইয়ের আকর্ষণের প্রথম দিক হচ্ছে প্রচ্ছদ। সেদিক দিয়ে চিত্রশিল্পী ও কার্টুনিস্ট বিপুল শাহ্’র করা প্রচ্ছদে শেওলাধরা ভেঙে পড়া দেয়ালের ছবিতে এই সমাজেরই ক্ষয়িষ্ণু সময়কেই সামনে নিয়ে আসে। এর প্রতিই লেখকের অনভ্যাস, অনাত্মসমর্পণ; গল্পের মধ্যে যা ফুটে উঠেছে। আর এখানেই লেখক ও প্রকাশনীর মুনশিয়ানা।

প্রথম দর্শনে আনকোড়া লেখকের বইয়ের আকর্ষণের অন্যান্য দিক হচ্ছে প্রিন্ট প্রিভিউ। অর্থাৎ বইয়ের স্টলে দাঁড়িয়ে কয়েক পাতা পড়ে লেখনীর একটা ধারণা নেওয়া। এটা অনেকটা ত্রুটিপূর্ণ পথ, এর মধ্য দিয়ে অনেক লেখক প্রাপ্য গুরুত্ব হারান। এখানে অলাত এহ্সান প্রশংসা পেতে পারেন। গল্পে প্রথম থেকেই পাঠককে ভেতরে টেনে নেওয়ার ক্ষমতা আছে। তার লেখনীতে বারবার যে দিকগুলো রোমাঞ্চিত করে, সেটা হচ্ছে তার লেখনীর বৈশিষ্ট্য। লেখকের প্রথম বই হওয়া সত্ত্বেও, এটা বুঝাতে সক্ষম ছিলেন যে, তিনি সহজে হারিয়ে যাওয়ার পাত্র নন।

অলাত এহ্সানের গল্পে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে হারিয়ে যাচ্ছে ব্যক্তি, তেমনি হারিয়ে যেতে থাকা হাজারো ঐতিহ্যের সংরক্ষণ আছে সেখানে। আবার গ্রামীণ কূটাচার-কুসংস্কার চর্চার পাশাপাশি লুকিয়ে আছে ব্যস্ত শহরের কর্পোরেট মানুষের জীবন। লেখক নিপুণভাবে সৃষ্টিতে তুলে ধরেছে কেন্দ্রীয় চরিত্রের প্রেম, ভালবাসাকে যা পাঠককে গল্পের মাঝে ডুবে থাকতে সাহায্য করবে।

তরুণ লেখকদের বইয়ে প্রথম যে দিকগুলো পাঠককে প্রচণ্ড একঘেয়েমি করে তুলে, বয়সের অনভিজ্ঞতার কারণেই কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো হয়ে পরে অপেক্ষাকৃত তরুণ। ঘটনার নির্বাচন, কাহিনী বিন্যাসেও তার প্রভাব পড়ে। এখানে অলাত তরুণ লেখক হলেও, লেখার প্রস্তুতি ও বিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায়। তাজউদ্দিন, বারী শেখ, সামচেল মিয়া, আকেল উদ্দিন কেউ-ই তরুণ নয়। যথেষ্ট বয়সী। কিন্তু কেউ বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত নন, প্রেমী, স্বচল-স্বক্রীয় চরিত্র তারা। যেমন ‘বোতলজাত বিষয়-আশয়’ গল্পের অন্যতম চরিত্র বারী শেখ। গল্পের অন্যান্য চরিত্রও কল্পনায়, অভিজ্ঞতায় দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। সেখানে এটা সম্পূর্ণভাবে বুঝাতে সক্ষম ছিলেন যে, কীভাবে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা কতিপয় কিছু স্বার্থবাদী মানুষ নিজেদের হাতের মুঠোয় করে রাখে। অবশ্য গল্পটা আবর্তিত হয়েছে মাঝবয়সী মানুষের প্রেম, যৌনতা ও সম্পদ অর্জনের কূটকৌশলের কাহিনির ভেতর।


বই হচ্ছে মানুষের কাল্পনিক চরিত্র তৈরির সহজতম প্রধান উৎস, আর সেই কাহিনি যদি হয় ব্যক্তি চরিত্র নির্ভর, তবে তা আরো সহজগামী হয় পাঠকের জন্য। অলাত এহ্সানের প্রত্যেক গল্পের পটভূমি ও চরিত্র ভিন্ন, প্রেক্ষাপটও বিস্তৃত। সেখানে যেকোন চরিত্র নিয়ে পাঠক হারিয়ে যেতে পারেন আপন কল্পজগতে


বইয়ের প্রথম গল্প ‘সাপ আর হিসহিসের গল্প’-এ সামান্য একটা প্রসঙ্গ তুলে লেখক কত সহজেই না দেখিয়ে দিয়েছে একদিকে কুসংস্কারে ভরা গ্রামীণ সমাজকে, অন্যদিকে রাষ্ট্র চাকায় জড়িয়ে থাকা দুর্নীতির ধামাচাপা। অপরদিকে ‘অন্ধ হয়ে যাওয়ার রাতটি’ আমাদের চোখে কিছুটা তিরস্কার দেখিয়ে অবলীলায় তুলে আনা হয়েছে অন্যায়কে সহ্য করার, রোবটিক জীবনযাপন। কিংবা কাব্যিক নামের ‘নীলগিরি পাহাড়ে সবুজের পুনরাবৃত্তি’ গল্পে আছে একটি যুবকের অসহায় আত্মসমর্পণ। যা বারংবার মনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে-আমরা যে প্রতিনিয়ত শোষিত হয়ে যাচ্ছি, সেই সাথে শহরকেন্দ্রিক!

তরুণ লেখক হিসেবে অলাত এহ্সানের লেখনীর বারবার আমাকে বিমোহিত করেছে। অনুবাদক-অধ্যাপক অভিজিৎ মুখার্জির ভূমিকার সাথে বাক্য মিলিয়ে বলাই যেতে পারে, ‘লেখকের চোখ আছে ঘটনাসমষ্টি থেকে গল্পটাকে খুঁজে নেওয়ার।’ যদিও এর মাঝে কয়েকটি গল্পকে মনে হয়েছে, বইকে মোটাতাজা করার উপকরণ। খুব চমৎকারভাবে লেখক ‘ইছহাক নামের পারিবারিক ভূত’ দিয়ে হৃদয় পৃষ্ঠে এঁকে দিচ্ছেন ব্রিটিশ ‘পোষ্যকোঠার’ আড়ালে থাকা শত অবিচার, আর তার বিপরীতে ইছহাক ভূতের ভেতর লুকানো পূর্বপুরুষের পরিচয়। যেখানে লেখক দেখিয়ে দিচ্ছে আমাদের হারিয়ে যাওয়া একান্নবর্তী পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ও সংগ্রামের ইতিহাস।

যে গল্পটির কথা না বললেই নয়, তা হচ্ছে ‘আশার বসতি’। এখানে লেখক দিয়েছে তার আগমনী বার্তা! অবচেতন মনে লেখক আবারো তুলে এনেছেন, আমাদের ভেঙে পড়া সমাজকে, সেইসাথে আজও এই সমাজ ব্যবস্থার কাছে মাথা না নুইয়ে যুদ্ধ করে যাওয়া তাজউদ্দীনদের। এদিকে ‘আয়নায় দেখা দুই হাত’ ছিল প্রেম, মোহ আর বাস্তবতার সাথে মিশে মানুষের ত্রিমুখী জীবন। তিনটি চরিত্রের হরর সাসপেন্সন।

বইয়ের ফ্ল্যাপে কবি সৈকত হাবিব লিখেছেন, ‘বিষয়ের সঙ্গে ভাষার, ভাষার সঙ্গে দেখা ও অনুভবের নিজস্বতা আর সবকিছুকে আত্মরস ও রসায়নে জাড়িত করে পরিবেশন করার দক্ষতা দেখে মনে হয় অলাত এহ্সান সাহিত্যের রান্নাবান্না বেশ প্রস্তুতি নিয়েই শিখছেন।’ তারসঙ্গে পরের বাক্য মিলিয়ে বলা যায়, আসুন পাঠক, সেই স্বাদ একটু চেখেই দেখা যাক! এমন লেখনীর স্বাদ না নিতে পারাটা বরং আফসোসের।

লেখক :  কবি ও সমালোচক। শিক্ষার্থী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

পিডিএসও/হেলাল