জন্মদিনে শ্রদ্ধা

নজরুল আধুনিক মানস ও নারীর ক্ষমতায়ন

প্রকাশ : ২৪ মে ২০১৯, ১২:৫৬

নূর কামরুন নাহার
কাজী নজরুল ইসলাম [জন্ম : ২৪ মে ১৮৯৯ মৃত্যু : ২৯ আগস্ট ১৯৭৬]

নজরুলের আবির্ভাব রবীন্দ্রবলয়ে। রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলা সাহিত্য, বাঙালির মনন আর প্রতিদিনের জীবনকে সূর্যের মতো আলোক দিচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ যখন হয়ে উঠেছে বাঙালির ঘর এবং বাহির, ঠিক তখনই প্রচন্ড এক ঝড়ের মতো এক তরুণের আবির্ভাব, যে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবকে দুমড়ে-মুচড়ে সৃষ্টি করে নতুন এক ভাষা। বিস্ময়ের, আনন্দের, বিদ্রোহের। বাঙালি অনুভব করে নতুন এক শক্তির। যে শক্তি নতুন জাগরণের কথা বলে, বিদ্রোহ আর বিরহের কথা বলে, প্রেম আর মানবতার কথা। সেই শানিত, অভিনব, আশ্চর্য, বিস্ময়কর প্রতিভার নাম নজরুল।

নজরুল দমকা এক বাতাসের মতো ঝড় তুলে আমাদের চিন্তার জগতে। নজরুলের প্রকাশ নতুন এক মাত্রা আনে ভাষা, সাহিত্য, ভাবনা এবং গতানুগতিক জীবন দেখায়। তার সৃষ্টি, কথা, কাজ চঞ্চলতা বাঙালিকে আড়মোড়া ভেঙে জাগিয়ে তুলে অন্য এক শক্তিতে। জড় আর জীর্ণতার অচলায়তন ভেঙে আনে গতি আর প্রাণ, মোহবিষ্ট করে নতুন সুর আর জাগরণের বাণীতে, শেখায় বিদ্রোহ আর প্রতিবাদের ভাষা। মূলত নজরুল যেন এক মুক্ত বিহঙ্গ কোনো জাত, বর্ণ, শ্রেণি, ধর্মান্ধতা, স্বার্থান্ধতা, কোনো বিশেষ শ্রেণির তাঁবেদারি কোনো কিছুই নেই তার, নেই মানসিক শৃঙ্খল আর কারো কোনো পরোয়া। সে এক মুক্তমানব। সত্য উচ্চারণে নির্ভীক ও নিঃসংকোচ। নজরুলের মতো এত অসাম্প্রদায়িক, সংস্কারহীন ব্যক্তিত্ব বাংলা সাহিত্যে কেন, বিশ্বসাহিত্যেও বিরল। নজরুল শ্রেণি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে ছিলেন মানবতার পক্ষের, সাম্যের, দেশ কাল জাতির ঊর্ধ্বে এক বিশ্ব নাগরিক। ‘গাহি সাম্যের গান মানুষের চেয়ে/বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’

নজরুল মানুষকে বিচার করেছিলেন মানুষ হিসেবে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ সকল বিভেদ বিসর্জন দিয়ে মানবতার জয়গান গেয়েছিলেন। এই মানবিকতার দৃষ্টিই নজরুলকে দিয়েছে নারীকে মানুষ হিসেবে বিচার করার ক্ষমতা। তার কণ্ঠে এ বিশ্ব, এ জগৎ, সব কাজ ও সৃষ্টিশীলতায় নারীর অংশগ্রহণের অকাট্য সত্য ও বাস্তবতার জয়ধ্বনি বেজে ওঠে, ঘোষিত হয় চির সত্যের বাণী। ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

নজরুল ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক জলন্ত শিখা। তার ভেতরে ছিল ক্ষোভ আর প্রতিরোধের গলিত লাভা। অন্যায়, অসাম্য, বৈষম্য মানবতার অপমানে নজরুল যেমন ছিলেন নির্ভীক কণ্ঠ; তেমনি সামাজিক অসাম্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নারীকেও নজরুল জাগাতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন নারী জেগে উঠুক তার আপন শক্তিতে। আগুনের লকলকে শিখার মতো জ্বলে উঠুক নারী—‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা/জাগো স্বাহা সীমান্তে রক্ত টিকা।/দিকে দিকে ফেলি তব লেলিহান রসনা/নেচে চল উন্মাদিনী নিরবসনা/জাগো হতভাগিনী, ধর্ষিতা নাগিনী।’

সমাজে নারীকে অশুভ আর অপয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাকে বিবেচনা করা হয় বোঝা হিসেবে। নজরুল নারীর মধ্যে কল্যাণ দেখেছিলেন, দেখেছিলেন মঙ্গলের আলোক শিখা। পৃথিবীকে জ্ঞান সৌন্দর্য আর সুষমার ভরে তুলতে নারীর শ্রম, ত্যাগ, বুদ্ধিমত্তাকে নজরুল তুলে এনেছিলেন তার কবিতায়—‘জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী নারী/সুষমা লক্ষ্মী নারীই ফিরেছে রূপে রূপে সঞ্চারি।’

নজরুলের চোখে নারী ছিল সম্ভাবনায় এক নতুন জগৎ। নারী পারে বিশ্ব বদলে দিতে, পারে জীবনের পাদ প্রদীপ জ্বেলে দিতে। এই নির্ভীক উদার উচ্চারণে নজরুলের কণ্ঠ কাঁপেনি। নজরুলের যুগ পার হয়ে আমরা আজ একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আছি। নারী আজ সব ক্ষেত্রে তার সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে, তবু আমরা মঙ্গলময় আলোকে নারীকে উদ্ভাসিত করতে দ্বিধান্বিত হই। বারবার আমাদের পিছুটানে হীনম্মন্যতা, কুপমন্ডুকতা। নারীর শক্তি এবং অবদানকে মূল্যায়নে আমরা কুণ্ঠিত হই। তার প্রকৃত পাপ্য দিতে কার্পণ্য করি। কিন্তু নজরুল তা করেননি, নারীর যে গৃহশ্রম আজও অবমূল্যায়িত এবং অদৃশ্য, আজও যা শ্রমের মর্যাদা পায়নি। সেই গৃহের জগতকেও নজরুল মূল্যায়ন করেছিলেন। গৃহে নারীর অবদান এবং গৃহকে আলোকময় করার মধ্যেই যে জগতকে আলোকিত করার বিষয়টি লুকিয়ে রয়েছে, তা নজরুল গভীর প্রজ্ঞা এবং উদার মানসিকতার দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই নজরুল বধূর মধ্যে দেখেছেন আলো, কল্যাণ, শুভ আর সৌন্দর্যের জগৎ—‘জাগো বধূ জাগো নব বাসরে/গৃহদীপ জ্বালো কল্যাণ করে।’

নারী মুক্তি ছিল নজরুল স্বপ্ন ও সাধ। তাই নারীত্বের জয়গানে মুখর ছিল তার কলম। নারীর লুকানো শক্তিমত্তায় ছিল তার বিশ্বাস ও আশা। নিষেধের বেড়াজাল আর প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে নারী যে জয় করবে, তা জানতেন নজরুল—‘শত নিষেধের সিন্দুর মাঝে অন্তরালের অন্তরীপ/তারি বুকে নারী বসে আছে জ্বালি বিপদ বাতির সিন্ধুদ্বীপ।’

নারীকে নজরুল বন্দনা করে মাতারূপে, দেবীরূপে, মাতৃরূপের মাঝেও দেখেছেন কল্যাণ। সেই মাতৃরূপের মধ্যেই তিনি আবার মুক্তির আলো জ্বালতে চেয়েছিলেন। বঞ্চিতা, সামাজিক কৃতক নিগৃহীতা, পরিত্যক্তা নারীর মধ্যেও শুভ, মঙ্গল এবং শক্তির জয় দেখেছেন—‘আমি জানি মাগো আলোকের লাগি তব এই অভিযান/হেরেম বন্দী যত গোলামের কাঁপায়ে তুলিত প্রাণ।/আমরা দেখেছি যত গালি ওরা ছুড়িয়া মেরেছে গায়/কাটার কুঞ্জের ছিলে নাগ-মাতা সদা উদ্যত ফনা/আঘাত করিতে আসিয়া আঘাত করিয়াছে বন্দনা।’

নারীকে দোষারোপের যে চিরাচরিত সামাজিক বিধান, পতিতা, বেশ্যা এ ধরনের নানা উপাধিতে নারীকে অবাঞ্ছিত, খাটো এবং অস্পৃশ্য করে রাখার যে ইতিহাস এবং পুরুষকে সকল দোষের ঊর্ধ্বে রাখার যে মানসিক প্রবণতা সেখানেও নজরুল স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে সত্যের পক্ষে ন্যায়ের পক্ষে তার বক্তব্য তুলে ধরেছেন—‘অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ-পুত্র হয়,/অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়।’

নজরুলের প্রকৃত অর্থেই ছিলেন মুক্তমনা, উদার ও গণতন্ত্রকামী। সাম্যের প্রতি, মনুষ্যত্বের প্রতি নজরুলের দীপ্ত উচ্চারণ শুধু কবি নজরুলের কাছে নয়, মানুষ নজরুলের কাছে বারবার আমাদের মাথা শ্রদ্ধানবনত করায়। তাই নারীর বন্দিত্ব, নারীর প্রতি পুরুষের বৈষম্য যে এক দিন পুরুষেরই ক্ষতির কারণ হবে, যে বিষয়ে কবি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ‘বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি/কেহ রহিবে না-বন্দি কাহারও উঠেছে ডঙ্কাবাজি।/নর যদি রাখে নারীরে বন্দি, তবে তারপর যুগে/আমারই রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে/যুগের ধর্ম তাই।/পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে, পীড়া দেবে তোমাকেই।’

নজরুল শুধু তার লেখায় নারীকে উজ্জ্বল করেননি। সাম্যের গান গাননি। নজরুল সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকায় নারীবাদী বহু লেখা ছাপা হয়েছে। সেসব লেখা এ যুগেও রচনাশৈলী, চিন্তার আধুনিকতা আর প্রকাশের স্পর্ধায় অতুলনীয়। ধূমকেতুরই এক সংখ্যার একজন লেখক মিসেস এম রহমানের বজ্রকণ্ঠের উচ্চারণ—‘আমরা চাই নারীত্বের সম্মান। বিশ্বস্রষ্টা দয়াময়ের দেওয়াটুকু কেড়ে নিও না। তার দরবারে বিচারপ্রার্থী হয়ে আসাীির স্থানে দাঁড় করায়। তখন কি জবাব দেবে স্বার্থপর পরস্বাপহারী দস্যু।’

কথায় কি বজ্র, কি শব্দ, বাণে বিদ্ধকরণ, প্রকাশের কি অগ্নিরূপ। আজ এত বছর পরেও এ ধরনের অগ্নিবাণের লেখা আমাদের নারীদের কলমে ফোটে কোথায়?

নজরুল বিদ্রোহ করছেন, বিপ্লবের ডাক দিয়েছেন, জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছেন, কিন্তু অন্তরে তিনি ছিলেন বিগলিত, কোমল। সারা জীবন তিনি ছুটেছেন স্বপ্নের পেছনে, স্বপ্নকে রাঙাতে চেয়েছেন। তাই তার সুন্দরের যে স্বপ্ন, সেখানেও বাস করেছে সুন্দরতম প্রিয়তম—‘আমার পনের আনা রয়েছে স্বপ্নে বিভোর, সৃষ্টির ব্যথায় ডগমগ, আর এক আনা করছে পলিটিকস, দিচ্ছে বক্তৃতা, গড়েছে সংঘ। নদীর জল চলছে সমুদ্রের সাথে মিলতে দুধারে গ্রাম সৃষ্টি করতে হয়। যেটুকু জল তার ব্যয় হচ্ছে দুধারের গ্রামবাসীর জন্য, তা তার এক আনা। আমার যত বলা... সেই বিপুলতাকে নিয়ে আমার সেই প্রিয়তম, সুন্দরতমকে নিয়ে।’

এ সুন্দরতম স্বপ্নের মূল ছিল মানবতার জয়গান। সত্য আর সুন্দরের উদ্বোধন। প্রত্যেক মানুষের ভেতর লুকায়িত শক্তি ও সৌন্দর্যের আবিষ্কার। নজরুলের চোখে তাই শ্রেণিবিভেদও ছিল না। চির সুন্দর আর শ্বাশত মানবতার বাণী ধ্বন্নিত হয়েছিল—‘বন্ধু তোমার বুক ভরা লোভ দুচোখে স্বার্থ ঠুলি।/নতুবা দেখিতে তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলি।/আবার গেয়েছিলেন—/সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি/এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোন এক মিলনের বাঁশি।’

এই মানবতাবোধেই নজরুলকে আলোকিত করেছিল, নারীকে নজরুল মূল্যায়ন করতে পেরেছিলেন মানুষ হিসেবে। নজরুল যেমন অন্তরে নারীর জাগরণ বিশ্বাস করতেন; তেমনি কর্মেও তিনি তার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। নজরুলের যুগে তার প্রথম গজল গেয়েছিলেন ইন্দুুবালা, আঙ্গুরবালা, রানী প্রমুখ গায়িকারা।

নজরুল মানবতার জয়গান গেয়েছিলেন তাই তার কাছে নারী-পুরুষের কোনো বৈষম্য ছিল না। নারী জাগরণের কথা, নারীর অবদানের কথা, তাই এত স্পষ্ট এত দ্ব্যর্থহীনভাবে নজরুলের কণ্ঠে বেজে উঠেছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, নজরুলের এই মানবতার, মানুষের জয়গানের বাণীকে যেমন আমরা অন্তরে ধারণ করতে পারেনি। উদার এবং মুক্তমনে যেমন মূল্যায়ন করতে পারিনি মানুষকে, তেমনি নজরুলকেও যথার্থভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি। সর্বক্ষেত্রে নজরুলকে খন্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যার যার স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। নজরুলের প্রকৃত চর্চা নেই। শুধু বিশেষ দিনগুলোতে নজরুলের জন্য মায়াকান্না করি। নজরুলের যে আদর্শ, মানবতার জয়গান গেয়েছিলেন, শ্রেণিহীন বৈষম্যহীন যে সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়নে আমাদের কোনো উদ্যোগ নেই।

সব বৈষম্য, বিভেদ আর অন্ধকারের জাল ছিঁড়ে নজরুলকে উদ্ধার করতে হবে। চেতনায় তার আদর্শকে ধারণ করতে হবে। নারী জাগরণের যে বাণী নজরুল দিয়েছিলেন, যে উদার ও আধুকিতাকে ধারণ করেছিলেন, তা মনের গভীরে রোপণ করতে হবে। সত্য, সুন্দর সাম্যের এ বাণী যেমন গ্রহণ করতে হবে সমাজকে। তেমনি নারীকেও আত্মস্থ করতে হবে এ জাগরণের বাণী। গতি সঞ্চার করতে হবে মনে এবং দেহে। সকল অন্ধ সংস্কার অন্যায় আর অসাম্যকে ঝেড়ে ফেলে সকল অবদমন, অবমূল্যায়ন এবং বৈষম্যকে দূর করে জ্বালিয়ে দিতে হবে আলোর শিখা। নিজের ভাগ্য, নিজের অবস্থান পরিবর্তনে নিজেকেই এগিয়ে আসতে হয়, নিজেকেই শক্তি সঞ্চয় করতে হয়, কারো দান, করুণা এবং সাহায্যে খুব বেশি দূর আগানো যায় না। তাই নজরুলের স্বপ্ন এবং হৃদয়ের ঐশ্বর্যকে অন্তরে ধারণ করে নজরুলের মতো সাহসী কণ্ঠে আওয়াজ তুলতে হবে—‘বল বীর বল উন্নত মম শির/শির নেহারি আমারি নত শির/ঐ শিখর হিমাদ্রির।’

পিডিএসও/হেলাল