মডারেন বউ

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৬:০৭

রিহাব মাহমুদ

‘বাসি মুখে চুমু খেতে চাও কেনো? একদম কাছে আসবা না। সর, সর বলছি। আগে ব্রাশ করে হাত-মুখ ধুয়ে এসো।’

প্রথমে হতভম্ব। পরে কাচুমাচু মুখে বাথরুমের দিকে পা বাড়ায় বশির মোল্লা। টয়লেট সেরে ফ্রেশ হয়ে বেডরুমে ঢুকতেই দেখে তরুলতা ড্রেসিং টেবিলের সামনে রুপচর্চায় ব্যস্ত। এখন আর তাকে বিরক্ত করা যাবে না বুঝে নিলো। কিন্তু এখনো যে নাস্তা করা হয়নি। স্বামীর দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে হুংকার দিলো- কি হলো, হা করে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? যাও চা বানিয়ে নিয়ে এসো। সকালে খালি পেটে লিকার চা না খেলে সারাদিন ভালো যায় না।

প্রমাদ গুনলো বশির মোল্লা। বউয়ের কথা না শুনলে রাত মাটি। উপায় নেই। এখন বাজে সকাল ৯টা। ১০টার মধ্যে কাজে বেরুতে হবে। যে বউ কপালে জুটেছে তাতে তার হাতে সকালে নাস্তা খেয়ে কাজে যাবে এ আশা করা বৃথা। উল্টো বউকেই নাস্তা তৈরি করে খাওয়াতে হবে। অবশ্য বশির মোল্লা রান্না-বান্নার কাজ সবই পারে। নয় বছর মধ্যপ্রাচ্যে কাটিয়ে এসেছে। ওখানে নিজেদের রান্না নিজেরাই করে খেয়েছে। চুলায় চায়ের পানি বসিয়ে দ্রুত বাসার সামনের দোকান থেকে পাউরুটি আর জেলি কিনে নিয়ে আসলো সে।

তরুলতাকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বশির মোল্লা বললো- পাউরুটি আর জেলি নিয়ে এসেছি, তুমি খেয়ে নিও।

বশির মোল্লা নাস্তা খেয়ে অফিসে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। বউ তখন মোবাইলে ফেসবুকিংয়ে ব্যস্ত। বশিরের খুব শখ ছিলো অফিসে যাবার সময় বউ জামাটা এগিয়ে দেবে। নাস্তার জন্য বারবার তাগাদা দেবে। সার্টের বোতাম লাগিয়ে দেবে। তখন বশির বউকে কাছে টেনে দুষ্টুমি করার চেষ্টা করবে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পায়ের মোজা পরে সে। তাকিয়ে দেখে বউ ম্যাসেজ লিখছে আর মিটিমিটি হাসছে। কার সাথে চ্যাটিং করছে কে জানে? বশির একবার জিজ্ঞেস করেছিলো, আচ্ছা তুমি সারাক্ষণ ফেসবুকে কার সাথে চ্যাটিং করো?

ব্যস, আর যায় কোথায়। সঙ্গে সঙ্গে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিলো তরুলতা। কি বললে তুমি? সারাক্ষণ চ্যাটিং করি মানে? আমি কার সাথে চ্যাটিং করি তা তোমাকে জানতে হবে কেন? এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তুমি কি আমাকে সন্দেহ করো?

তখন বশির আমতা আমতা করে বলে, না মানে, আসলে সারাক্ষণ দেখি…

কি! আমি সারাক্ষণ ফেসবুকে চ্যাটিং করি। তুমি আমার নামে এরকম মিথ্যে অপবাদ দিতে পারলে। তুমি আমাকে সন্দেহ করতে পারলে? এত ছোটলোক তুমি। ছি ছি আমার জানা ছিলো না তুমি এতো ছোটলোক। আগে জানলে তোমার মতো ছোটলোককে কখনো বিয়ে করতাম না। কতো স্মার্ট স্মার্ট ছেলে আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো তাদের বিয়ে না করে আমি তোমাকে বিয়ে করেছি। এই তার নমুনা। ছোটলোক, ধোকাবাজ।

বশির তাজ্জব বনে গিয়েছিলো। কি বলতে চেয়েছিলো আর কি শুনতে হলো। এই কী তাহলে নারীর ধরণ? বশির মেলাতে পারে না। তখন বউকে থামাবার জন্যই হউক কিংবা বউয়ের রাগ কমানোর জন্যই হউক, বউকে শান্ত করতে আলতো করে তার হাতটা ধরে বলার চেষ্টা করেছিলো, সরি, আমার ভুল হয়ে গেছে…

খবরদার, আমাকে টাচ্ করবি না। ছোটলোক, জানোয়ার। তোর মতো জানোয়ারকে বিয়ে করাই ভুল হয়েছে। কত্তো বড় সাহস, আমাকে সন্দেহ করে।

না না, আমি তোমাকে সন্দেহ করি নাই… এটা মিথ্যে কথা…

কি, আমি মিথ্যা বলছি? আমাকে মিথ্যাবাদী বললি? বের হ, এই তুই এক্ষুণি এই বাসা থেকে বের হ। শালা, কুত্তার বাচ্চা। জানোয়ারের বাচ্চা জানোয়ার। এখন আমাকে মিথ্যাবাদী বলছে। শালা তুই মিথ্যাবাদী, তোর গোষ্ঠীশুদ্ধা মিথ্যাবাদী। ছোটলোক। তোরা গোষ্ঠিীশুদ্ধা ছোটলোক।

বশিরের সারা শরীর রাগে জ্বলেছিলো। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়েছিলো সে। এই অবস্থায় বশির রেগে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। বশির নিজেকে কন্ট্রোল করতে অন্যত্র সরে গিয়েছিলো।

সেই থেকে বশির তরুলতাকে ফেসবুকিং নিয়ে কিছু বলে না। বশির নিজে ফেসবুক ব্যবহার করেনা। কিন্তু বশির বুঝতে পারে, তরুলতা ছেলেদের সাথে চ্যাটিং করে। যখন তরুলতা চ্যাটিং করে তখন বশির হঠাৎ সামনে এসে পড়লে তরুলতা দ্রুত ফেসবুক থেকে অন্য সাইটে চলে যায়। তার চেহরার মধ্যে যে ভরকে যাওয়া ফুটে উঠে মিলিয়ে যায় তা বশিরের চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না। একবার মাঝরাতে বশিরের ঘুম ভাঙলো তরুলতার মোবাইলে ইমোতে কল আসার শব্দে। তরুলতা তখন গভীর ঘুমে। হয়তো ভুলে মোবাইলের নেট অপশন অফ করতে ভুলে গিয়েছিলো। বশির মোবাইল নিয়ে দেখে একটা ছেলে ইমোতে কল দিছে। বশির অনিচ্ছা সত্বেও মোবাইল নিয়ে দেখে এই ছেলের সঙ্গে অনেক ম্যাসেজ আদান-প্রদান হয়েছে। যার দুই একলাইন পড়ে আর রুচি কাজ করেনি। কিন্তু বশির কিছু বলে না। বশির মনে মনে আল্লাহর কাছে বিচার দেয়। আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়। বশির জানে, চোরের দশদিন গেরস্থের একদিন। তরুলতা অন্যায় করলে একদিন তাকে তার প্রতিদান দিতে হবে। উপরে একজন আল্লাহ আছেন। বউ স্বামীর কাছে ফাঁকি দিলেও আল্লাহর কাছে ফাঁকি দিতে পারবে না। বশির আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলেন যেন বউকে হেদায়েত দান করেন। বশির বউয়ের মোবাইল কখনোই স্পর্শ করে না। কারণ বশির জানে, ময়লা যতো ঘাটবে ততো ময়লাই বের হবে।

বশির মোল্লা অফিসে এসে কাজে মনযোগ দেয়। আলাউদ্দিন ভাই এসে ঘাড়ে হাত রাখে।

কি মিয়া, এতো কি কাম করো? চলো নিচে গিয়া চা-বিড়ি ফুঁকে আসি।

আলাউদ্দিন ভাই বশির মোল্লার ক্লোজ লোক। যেকোনো সমস্যা আলাউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে শেয়ার করে বশির। আলাউদ্দিন ভাইও নিজের ব্যক্তিগত অনেক কিছু বশিরের সাথে শেয়ার করে।

বশির আলাউদ্দিন ভাইসহ নিচে নেমে আসে। জামালের চায়ের দোকানে চায়ের অর্ডার দিয়ে বসে।

কি মিয়া, মুখটা শুকনা ক্যান? বউয়ের লগে ঝগড়া?

বশির দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। হাসার চেষ্টা করে। বলে, না ঝগড়া না। তবে আমার কপালটাই খারাপ। ভাবছিলাম জীবনে বিয়ে করলে সুখে সংসার করবো।

তোমার তো মিয়া মডারেন বউ। এই যুগের মাইয়ারা এমনই। বাইরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট। সংসারের কতৃত্ব ওগো হাতে। ওরা যা বলবে তাই করতে হইবো। না কইরলে সাড়ে সর্বনাশ। কি আর করবা কউ। এটা মাইনা নিয়া সংসার কইরতে হইবো।

বশির কোনো কথা বলে না। জামাল এসে চা দেয়। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বশির ভাবে না জানি তরুলতা এখন বাসায় কি করছে। বশিরের মাথায় অনেক বাজে চিন্তা আসে। কিন্তু বশির তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে। এইসব চিন্তা মাথায় আসার পেছনে তো তরুলতা দায়ী।

যোহরের আযান হচ্ছে। চায়ের দাম মিটিয়ে পাশের মসজিদে ঢুকে তারা। বশির খেয়াল করেছে নামাজ পড়লে মনটা হালকা থাকে। তাই নামাজ বাদ দেয় না সে। একবার তরুলতাকে নামাজের কথা বলেছিলো বশির। জবাবে তরুলতা বলেছিলো- যার যার চরকায় তার তার তেল দেয়া উচিত। বশির আর কিছু বলে নাই। কারণ, কিছু বললেই ঝগড়া করে। গালাগালি করে। পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। সংসারে শান্তি বজায়ের জন্য বশির অনেক কিছু মেনে নেয়। আর এটাকেই দুর্বলতা মনে করে তরুলতা বশিরের উপর মানসিক অত্যাচার করে। তাতে বশিরের মনে ক্ষোভ জন্মে। কিন্তু আল্লাহর ভয়ে বশির সব ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে। তরুলতার ব্যবহারে বশিরের মনে এতো বেশি ক্ষোভ জমে আছে যে কারণে বশির মন থেকে তরুলতার সঙ্গে সহজ হতে পারে না। কেন জানি আসে না।

রাতে বাসায় ফিরতে ১১টা বাজে বশিরের। চাঁবি দিয়ে দরজার লক খুলে দেখে খাটে শুয়ে আছে তরুলতা। এই সারাদিনে তরুলতা একবারও স্বামীর খোঁজ করেনি। বশির খেয়েছে কিনা, কি খেয়েছে। কখন আসবে বাসায়? অথচ বশির দুপুরে তরুলতাকে ফোন করেছিলো। কিন্তু তরুলতা পরে কথা বলবো বলে ফোন রেখে দিয়েছিলো।

তরুলতা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। বশির চোখ বুলিয়ে দেখে সকালে যে জিনিস যেখানে যেরকম দেখে গিয়েছিলো তা সেরকমই আছে। বশির ডাকলো, শুনছো?

তরুলতা চোখ মেলে তাকায়।

খেয়েছো ‍তুমি?

বশিরের প্রশ্নে তরুলতা চোখ বড় বড় করে বলে, এখন কয়টা বাজে?

রাত ১১টা।

ভাত তো রান্না করিনি। আমি তো ভাবলাম মাত্র ৯টা বাজে।

দুপুরে খাওনি?

পাউরুটি খেয়েছি।

প্রমাদ গুনে বশির। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। বউয়ের দিকে চেয়ে থাকলে আর খাওয়া হবে না। বশির চুপচাপ রান্নাঘরে যায়। চাল ধুয়ে চুলায় বসায়। ফ্রিজে কতো কি আছে। কিন্তু কিছুই রান্না নেই। ডিম ভেজে খেতে হবে এছাড়া উপায় নেই। এই তার কপাল। তরুলতাকে এ বিষয়ে এখন কিছু বলা যাবে না। তাহলে বাড়ি মাথায় তুলবে। তরুলতার কোনো দোষ ধরা যাবে না। একটা দোষ ধরলে তা ঢাকতে বশিরকে মুহূর্তের মধ্যে অপরাধী বানিয়ে ফেলবে। অতীত টান দিয়ে এমনভাবে অনর্গল বলা শুরু করবে তা শুনলে যে কেউ বশিরকে দোষী ভাববে। বশির জানে সংসারে ছেলেরা কতো অসহায়। একটা মেয়ে নিজে জেতার জন্য কতো বানিয়ে মিথ্যে কথা বলে। কিন্তু ছেলেরা তা পারে না।

ভাত বসানোর পর তরুলতা আসে।

ও তুমি ভাত বসাই দিছো। আমি তো আসছিলাম।

বশির মনে মনে বলে, সারাদিনে তো আসলা না। এখন রাত বাজে সোয়া ১১টা। এখন আসতেছো।

রাতে খাওয়ার পর যখন শুয়ে পড়লো তখন তরুলতা বললো- তোমার সাথে একটা জরুরি কথা আছে।

বশিরের বুকটা দুরুদুরু করে উঠে। কোন প্রসঙ্গে কথা বলবে আর বশির কিছু বললে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। সাবধান থাকতে হবে।

বলো কি কথা?

আগামী সপ্তাহে আমার ফুপাতো বোনের বিয়ে। আমার কিছু কেনাকাটা আছে। কালকেই মার্কেটে যাবো।

বশিরের বুকটা ছ্যাৎ করে উঠে। এখন মাসের শেষ। হাতে টাকাও নেই। কিভাবে সামলাবে বউকে।

আচ্ছা, আমি বেতন পেয়ে তোমাকে টাকা দেবো।

বেতন পেয়ে দেবে মানে? তুমি কবে বেতন পাবে আমি কি সেদিনের অপেক্ষায় বসে থাকবো।

কিন্তু তরুলতা, আমার কাছে তো এখন এতো টাকা নেই। তোমার কতো লাগতে পারে?

কতো আর। একটা গায়ে হলুদের শাড়ি আর একটা বিয়ের শাড়ি। সঙ্গে ম্যাচিং করে সব। দশ হাজার।

ভিতরে ভিতরে চমকায় বশির। তরুলতা যতো সহজে দশ হাজার উল্লেখ করেছে তা দেয়া যে বশিরের পক্ষে কতটা কষ্টসাধ্য তা একমাত্র বশিরই জানে।

এত টাকা আমি এখন কোথায় পাবো?

কোথায় পাবে তা আমি কি জানি। আমার টাকা লাগবে ব্যস।

দুইদিন পরে দিলে হয় না?

কেন? আমার কালকেই লাগবে।

বশির চুপ করে থাকে। সামনে বিপদ টের পায়। কালকের মধ্যে দশ হাজার টাকা কিভাবে ম্যানেজ করবে তা মাথায় আসছে না। বেতন পেতে এখনো দশদিন বাকি। বশির অসহায় বোধ করে। আলাউদ্দিন ভাইয়ের কথাগুলো মনে পড়ে- তোমার তো মিয়া মডারেন বউ। এই যুগের মাইয়ারা এমনই…

বশির ভাবে। কীভাবে মানিয়ে বাকি জীবন কাটাবে? চোখ থেকে ঘুম উধাও। বশিরের কান্না পায়। রাত তখন ৩টা। তরুলতা বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। বশির উঠে অজু করে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে। আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। সিজদায় পড়ে কাঁদে। বশিরের কান্না কেউ দেখে না। আল্লাহ ছাড়া। বশির অপেক্ষায় আছে একদিন আল্লাহ তার সব মনোকষ্ট দূর করে দেবে। মডারেন বউরা একদিন তাদের ভুল বুঝতে পারবে। তারা স্বামীর কথামতো চলবে। কথায় কথায় স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করবে না। কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করবে না। স্বামীর মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করবে। স্বামীর পছন্দ অপছন্দকে মূল্যায়ন করবে। স্বার্থপরের মতো নিজেরটা আদায় করার জন্য স্বামীর উপর চাপ সৃষ্টি করবে না। স্বামীর মন জুগিয়ে চললেই তো স্বামীর মনও পাবে। স্বামীকে সম্মান করলে তো নিজেও স্বামীর কাছে সম্মান পাবে।

                                                                                                                                                                                          -চলবে