বীরেন মুখার্জী : কবিতার নতুন কণ্ঠস্বর

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:০৯ | আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:৩৫

অজয় রায়
ama ami

চলমান প্রতিস্বর ছাড়াও তার কবিতা ক্ল্যাসিক উপকরণসঞ্জাত। এই দুটো বুদ্ধিদীপ্ত সংমিশ্রণ তার কবিতাকে যে বিশেষত্ব দান করেছে, তা অভিনব। তার এগিয়ে যাওয়া তাই প্রত্যয়ী স্বরে। সে স্বর তার নিজস্ব পারঙ্গমতাসিদ্ধ। একাকি পথচলা ও সে পথে আবিষ্কৃত সিদ্ধিই তাকে খ্যাতিমান করে তুলেছে। তার কবিতায় আছে যথাযথ শব্দ প্রয়োগ, আছে অভিনবত্ব। তিনি সবসময় ভিন্নস্বরে নতুন কিছুর প্রতি ইশারা দিয়ে চলেছেন। এভাবে তার কবিতা হয়ে উঠেছে ষোলকলায় পূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ের কবিদের কাছে তার কবিতা অনুকরণযোগ্যই শুধু নয় বরং তা কবিতার নতুন দিগন্তে এক নবরাগ। বলছিলাম নব্বইয়ের দশকের শক্তিমান কবি বীরেন মুখার্জীর কবিতা নিয়ে।

এবার উদাহরণ দিয়ে বলি—‘লোভাতুর আঙুলগুলো তখনও/ভেসে বেড়াবে না দেখা আঙুর পাতায়।’ (অহিংসা) অথবা, ‘কখনো হাঁটতে হাঁটতে পথিমধ্যে অনুমোদন পেয়ে যাবে সূর্য ফোটার দিন।’ (অগণন বৃষ্টির ভেতর)

কবির স্বকীয়স্বর সূর্য ‘ফোটার দিনের মতো’ই ঝলমলিয়ে উঠল। তার শব্দ ব্যবহারের প্রাখর্য পাঠককে রীতিমতো বিমোহিত করে তোলে। আর এই সম্মোহনই কাব্যিক মাত্রায় নতুন সংরাগ স্থাপন করে। ‘দুষ্প্রাপ্য গাছের বাকল বেয়েই নেমে এসেছিল নগরীতে-বহুবর্ণ সাপ/আচম্বিতে পা-পথ সরিয়ে নিতেই দুদ্দাড় দখল করেছিল রাজপথ/শোবার ঘর ও ফনিমনসার বাগান।’ (অহিংসা)

কবিতায় অতিরিক্ত শব্দ সাজালেই তা কবিতা হয় না। বরং তা শব্দজট তৈরি করে। অকারণ মেদবহুলতা কবিতাকে বাহুল্য দোষে দুষ্ট করে। ইদানীং অধিকাংশ কবিদের এই ত্রুটি বড়ো পীড়াদায়ক। তারা নতুন শব্দবন্ধ, শব্দের মৌলিক অভিনিবেশ, কাব্যিক স্বরক্ষেপনে নিতান্তই দুর্বল। এরা চর্বিত-চর্বনের মতো ট্রাডিশনালিজমে অভ্যস্ত। ভাঙনহীন স্থবিরতায় ক্লান্ত। কবি বীরেন মুখার্জী সেখানে অনুকরণীয় সৌকর্যে দীপ্ত। সম্পূর্ণ নতুন তার নির্মিতি। তিনি লিখলেই কবিতা হয়। তার ঝরঝরে নির্মেদ কবিতা চঞ্চলা নৃত্যপটীয়সীর মতো স্মিত হাস্যে পাঠকের মননকে দখল করে নেয়। হঠাৎ করে তিনি যখন বলে ওঠেন—‘একবিন্দু অশ্রু চেয়েছি/বিনিময়ে পতঙ্গসম্ভূত পাপ তুলে দাও।’ (অশ্রুলিপি)


কবিতার সংজ্ঞা আজ বহুবিচিত্র। ওয়ার্ডওয়ার্থ, আরনল্ড, কীটস, শেলি, এলিয়ট থেকে রবীন্দ্রনাথ হয়ে জীবনানন্দ পর্যন্ত আধুনিক শত কবি কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্বরে কথা বললেও, কেউ যা অস্বীকার করেননি তাহলো—কাব্যময়তা বা Poetic order. কাব্যময়তাই কবিতাকে সত্যিকারের কবিতা করে তোলে। কবি বীরেন মুখার্জী এই ক্ষেত্রে নিপুণ গালিচা বিছিয়ে দিয়েছেন


পাঠকের মন দুলে ওঠে তার কাব্যিক বাঙময়তায়, যখন তার উচ্চারণ—‘পানশালার গোপন আড্ডা থেকে একমুঠো মুখরা শব্দ নিয়ে হেঁটে যেতে চাই কবিতার অলিগলি জলাঙ্গীর ঢেউ গুনে দেবদারু সাহসে সুউচ্চ মিনারে দাঁড়াতে চাই।’ কি অপূর্ব মাধুরীতে ঝরে পড়ে তার কাব্যের মাধুর্য যখন দেখি—‘তোর পাখিটি বোঝে, বিষাদের ঘোর লাগা দিন/পাতার ওড়ার করণকৌশল, স্তন ছুঁঁয়ে বসে থাকা মৃত্তিকার পাপ/আর অভিমানী গোপন আখ্যান!’ অথবা, ‘তোর পাখিটি বোঝে, নীরবতা মানে সোমত্ত কবিতা/তৃষ্ণার আড়ালে এক পৌরাণিক দ্বীপ...।’ (প্রস্থানের চিত্রকল্প)

বীরেন মুখার্জীর কবিতার জাগতিক প্রকরণেও শিল্প সংহতির অদ্ভুত উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। ‘নিজেকে ভুলে থাকার মহড়া করি প্রতিদিন/সবজি বিক্রেতা, দুধওয়ালার নাম-ধাম ভুলে যাই,/মাছ বাজারে শব্দ ফেরি করা পোস্টম্যানের মতোই/আলু-কচু আড়চোখে তাকায়, বণিকের শোকেসে;/চোখ কচলিয়ে দেখি, মুহ্যমান শোকের থালায়/উপচে ফোটে, সারি সারি হিংসার মুকুল।’ (ভণিতাজীবন)

আগেই বলেছি, বীরেন মুখার্জীর কবিতা ভিন্নস্বরের। অনেক নাম করা কবির কবিতা পড়তে গেলেও যখন লাইনের পর লাইনে দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তখন, তরুণ এই কবি উল্টোমুখী। সমৃদ্ধি-ধন্য। কিছু কবিতা থেকে অল্প অল্প করে উদ্ধৃতি দিচ্ছি—১. ‘সংবেদনময় হাতে কেঁপে ওঠে ফসলের ঘুম।’ (সারমর্ম) ২. ‘নেপথ্য ঘটনা জানতে গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা/দারিদ্র যেখানে গোল হয়ে ঘুমায়, ফুটপাথে।’ (নেপথ্য ঘটনা) ৩. ‘কতটুকুই বা গোপন হতে জানি!/তারপরও রাত্রিকে রাত্রি বলে ডাকি।’ (গোপনতাকামী) ৪. ‘চিৎকারের অ্যাপ্রোন থেকে উঠে আসে/শোকার্থ স্বর; একবার, বহুবার।’ (সরিয়ে দাও সমূহ প্ররোচনা)

এ রকম বারবার উদ্ধৃতি দেওয়া চলে তার কবিতার পঙক্তি। সত্যিকার অর্থে বীরেন মুখার্জীর কবিতায় যে কাব্যিক মাধুরী মাদকতার সংবেদন তৈরি করে তা বিরল; এ প্রবণতা তাকে সত্যিকারের কবি করে তুলেছে। তার কবিতা—‘Poetry is nothing but be’ সংজ্ঞার সার্থক প্রত্যয়ন। কবিতার সংজ্ঞা আজ বহুবিচিত্র। ওয়ার্ডওয়ার্থ, আরনল্ড, কীটস, শেলি, এলিয়ট থেকে রবীন্দ্রনাথ হয়ে জীবনানন্দ পর্যন্ত আধুনিক শত কবি কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্বরে কথা বললেও, কেউ যা অস্বীকার করেননি তাহলো—কাব্যময়তা বা Poetic order. কাব্যময়তাই কবিতাকে সত্যিকারের কবিতা করে তোলে। কবি বীরেন মুখার্জী এই ক্ষেত্রে নিপুণ গালিচা বিছিয়ে দিয়েছেন। পঙক্তির পর পঙক্তিতে তার নান্দনিক অভিসার। তার বিনম্র শাব্দিক দ্যোতনা মোহমুগ্ধ করে, যখন তিনি বলেন—‘মাছরাঙার পালকে রৌদ্রের গন্ধ ঢেলে শতবর্ষী বৃক্ষ মাতাল করে অলৌকিক জলের শরীর।’

স্বীকার করতেই হবে, কবিতা স্থির কোনো তথ্যচিত্র নয়। বরং কালের আবর্তে বিবর্তিত শৈল্পিক শব্দদ্যুতি। গোটা পৃথিবীর কবিদের নান্দনিক স্রোতধারা সমৃদ্ধ এক বুননশিল্প। একের পর এক সেখানে চলে ভাঙা-গড়ার খেলা। কবিতাকে কাব্যময় করতে হলে সেখানে প্রথমেই আনতে হয় ছন্দদ্যোতনার সঙ্গে কাব্যিক প্রকরণ। যাতে থাকে অলংকরণের প্রত্যর্পণ। আর এ কাজটি করতে গিয়ে বিশ্বব্যাপী কবিরা নতুন করে ভাঙতে থাকেন নিজেকে। রেফেল ও প্রি-রেফেল চিত্রশিল্পের অনুরণন ঝরে পড়ে সেখানে। সে আদর্শের অনুসরণে সালভাদর দালির হাত ধরে অবশেষে পরিণতি পায় স্যুরিয়ালিজমের অভিব্যক্তি। ইংরেজ কবি জন ডানের মেটাফিজিক্যাল অস্তিত্বও খানিকটা এই রকম। তবে স্যুরিয়ালিজমের সৌকর্যে চিত্রধ্বনির কারুকাজ আরো বর্ণিল মাত্রা পেয়ে যায়। পরাবাস্তবতা রূপ নেয় কল্পনায়, আর তা শব্দ চিত্রে রূপ নেয় চিত্রকল্পে। বীরেন মুখার্জী তার চিত্রকল্পে নানা রঙে নানা ঢঙে জ্যান্ত। বহুবর্ণিল। উদাহরণ দিয়ে বলি—মেঘের ঘুড়ি, বুকের জলাশয়, সান্ধ্যদীঘি, ক্যানভর্তি ফুটপাত, জলের কাঁচুলি, কঙ্কনস্নিগ্ধ হাত—এরকম অসংখ্য চিত্রকল্প তার সৃষ্টি। তবুও তার কবিতা নেগেটিভ মার্কিং নেই এ রকমটি নয়। তবে পরিমাণে কম। কবি মূলত কাজ করেছেন আর্ট ফর আর্ট সেকের ওপর। পাঠক হিসেবে তার কবিতাকে আরো থিমেটিক দেখতে চাওয়া নিশ্চয়ই দোষের নয়। আমি মনে করি, সেটা আর্ট ফর লাইফ সেক হলেই হবে।

একটা মজার কথা বলে লেখা শেষ করতে চাই। সাধারণত আমি কারো কবিতার পর্যালোচনা করতে চাই না, সমালোচনা লিখতে চাই না। হয়তো এটা আমার অপারগতা। অথবা, এটাও হতে পারে যাদের কবিতা নিয়ে লিখব, সেখানে লেখার মতো উপকরণ পাই না। শুধু অকারণ স্তূতি করতে হয়, তাই! অন্যদিকে বীরেন মুখার্জীর কবিতা নিয়ে লিখব বলে, বাংলা একাডেমি চত্বরে দাঁড়িয়ে তার বই চেয়ে নিয়ে এসেছি। এ ভালোবাসা ব্যক্তি বীরেন মুখার্জীর প্রতি যতটুকু, তারচেয়ে ঢের বেশি তার কবিতার শক্তির ওপর। কেন থাকবে না, যিনি বলতে পারেন—‘অনামিকা বাঁকিয়ে দাও উন্নত বিশ্বের উদ্ধত চাঁদের বাগানে/ডাকনাম নেই এমন বান্ধবীর মায়ার গভীরতা মাপতে/সমুদ্রফিতার দরকার নেই...।’ (নবায়ন)

কী কাব্যময় ভাবা যায়! নয়টি কবিতাগ্রন্থে সূচিভুক্ত কবিতায় এমন অসংখ্য পঙক্তির তিনি সৃষ্টি করেছেন। সত্যি বলতে এমন একজন কবির জন্য আগামীর পাঠক অপেক্ষা করে থাকেন।

লেখক : কবি ও সাহিত্য আলোচক
অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, কেএম কলেজ খুলনা

পিডিএসও/মীর হেলাল