বিদ্রোহী কবি

প্রকাশ | ৩১ আগস্ট ২০১৮, ১৬:২৩ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:৩৩

পৃথ্বীশ চক্রবর্ত্তী
কাজী নজরুল ইসলাম। প্রতিকৃতি : ফুয়াদ শেখ

‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু/এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!’—বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্ভবত নজরুলের এই কবিতা পড়ে অথবা তার সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা দেখেই লিখেছিলেন, ‘আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/দুর্দিনের এই দুর্র্গশিরে/উড়িয়ে দে তোর বিজয়-কেতন।’ 

সত্যি সত্যিই ভারতবর্ষের ঘন-কালো অন্ধকার আকাশে আলোকোজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ‘ধূমকেতুুর মতো যার আবির্ভাব তিনি আমাদের বাংলাসাহিত্যের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি একাধারে কবি, ছড়াশিল্পী, দার্শনিক, গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, সংগীত পরিচালক, নাট্যকার, নাট্যাভিনেতা, বংশীবাদক, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, গল্পকার, সাংবাদিক, সম্পাদক ও সৈনিক। 

তার বৈশিষ্ট্য তিনি রাজনীতিবিদ, মানবপ্রেমিক, সমাজসংস্কারক, শিক্ষানুরাগী, অসাম্প্রদায়িক ভারতবর্ষের রূপকার, সজীব-প্রাণবন্ত, সহজ-সরল, সুন্দর ও মুক্তমনের মানুষ। লেখালেখির ক্ষেত্রে সবকিছু ছাড়িয়ে তার কবিতা ও গান বাংলাসাহিত্যের এক বিশাল স্থান দখল করে নিয়েছে। কবিতা ও গান রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ তার সমকক্ষ নন বললেও অত্যুক্তি হবে না। তার কবিতা ও গান হৃদয় অণুরণনের। তার কবিতা ও গান মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের। তার কবিতা ও গান প্রেমের। তার কবিতা ও গান ভাবের। তার কবিতা ও গান বিদ্রোহের। তার কবিতা ও গান ভক্তিতত্ত্বের। তার কবিতা ও গান অসাম্প্রদায়িকতার। 

তার কবিতা ও গান জালেম শাসক ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে রচিত। তার কবিতা ও গান হিংস্র পশ্চিম পাকিস্তানি শোষকের বিরুদ্ধে সৃজিত। তার কবিতা ও গান পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার। তার কবিতা ও গান স্বাধীনতার। তার কবিতা ও গান মুক্তির। তার কবিতা ও গানে নিরীহ, নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত দুর্বল মানুষগুলো পায় শক্তি, সাহস ও বল। তার কবিতা ও গান অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে। তার কবিতা ও গান সৃষ্টি করে প্রেমানুভূতি। তার কবিতা ও গান মনুষ্যত্ব বোধের। তার কবিতা ও গান বিশ্বভ্রাতৃত্বের ও বিশ্বের সকল সুন্দরের। 

নজরুল কবিতা লিখেননি এমন কোনো বিষয় নেই। তবে তিনি সব বিষয়ে কবিতা লিখলেও বাংলাসাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে তিনি স্বীকৃত। তার বিশ্ববিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি তাকে বিশ্বে পরিচিত করেছে। তার অসাধারণ এ কবিতা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত এবং আলোচিত ও সমালোচিত। মার্কিন সমালোচক হেনরি গ্লাসি তার বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ কবিতা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ‘আমার কাছে বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ দুটি কবিতা হলো W. B. Yeats-এর ‘The Second Coming’ এবং অন্যটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘The Rebel’। 

মুজফফর আহমদ তার স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন, ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কলকাতার ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাড়িতে রচিত হয়েছিল।’ ঐ ঘরে নজরুল ও তিনি ভাড়া থাকতেন। নজরুল রাতে এই কবিতাটি লিখেছিলেন। রাত ১০টার পর কবিতাটি লেখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম শ্রোতা মুজফফর আহমদ। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি (শুক্রবার, ২২ পৌষ ১৩২৮ বঙ্গাব্দ) তারিখে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি তৎকালীন ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। ছাপা হওয়ার পর পত্রিকার চাহিদা এতই বেড়েছিল যে, ‘বিজলী’ কাগজ সপ্তাহে দু’বার ছাপা হয়েছিল। পরবর্তীতে ‘মোসলেম ভারত’ ও ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়ও ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ছাপা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও সে সময় এ কবিতা বিমুগ্ধ করেছিল। তবে কবিতাটি বিশিষ্টজনের প্রশংসা লাভ করলেও সমালোচিত কম হয়নি। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের দুই বছর পর ‘শনিবারের চিঠি’র একাদশ (আশ্বিন ১৩৩১ বঙ্গাব্দ) সংখ্যায় ভবকুমার প্রধান রচিত প্যারোডি কবিতা ‘ব্যাঙ’ ভূমিকাসহ প্রকাশিত হয়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিকে প্যারোডি করা হয়েছিল এভাবে—‘আমি ব্যাঙ/লম্বা আমার ঠ্যাঙ/ভৈরব রভসে বর্ষা আসিলে ডাকি যে গ্যাঙোর গ্যাং।/আমি ব্যাঙ/আমি পথ হতে পথে দিয়ে চলি লাফ;/শ্রাবণ নিশায় পরশে আমার সাহসিকা/অভিসারিকা/ডেকে ওঠে বাপ বাপ।’

শনিবারের চিঠিতে নজরুলের কবিতার প্যারোডি প্রকাশের পাশাপাশি গান, কবিতা ইত্যাদি সৃষ্টিকর্ম নিয়ে বিদ্রুপাত্মক গদ্যও প্রকাশিত হয়। এমন কি ‘বিদ্রোহী’ রচনার পর কবি মোহিতলাল মজুমদারের সঙ্গেও কাজী নজরুলের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়। 

‘আমি হিন্দু-মুসলমানের পরিপূর্ণ মিলনে বিশ্বাসী। তাই তাদের সংস্কারে আঘাত হানবার জন্যই মুসলমানি শব্দ ব্যবহার করি বা হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিই।’ এমন উক্তি যার তিনি নজরুল। গোটা ভারতবর্ষের অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার রূপকার তিনি। তার মতো এত বিরাট অসাম্প্রদায়িক মহীরুহ ভারতবর্ষে  দ্বিতীয়জন ছিল বলে মনে হয় না। বিশেষ করে হিন্দু-মুসলিমকে পৃথক করে দেখার তার মনে কোনো দিনই ছিল না। বরং তিনি হিন্দু-মুসলিমকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তাইতো তিনি লিখলেন,  ‘মোরা এক বৃন্তে দু’টি ফুল হিন্দু-মুসলমান/মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তার প্রাণ।/মোরা এক সে দেশের মাটিতে পাই/কেউ গোরে, কেউ শ্মশানে ঠাঁই;/মোরা এক ভাষাতে মাকে ডাকি, এক সুরেতে গাই গান।’

শুধু সাহিত্যে নয় বাস্তবেই তিনি হিন্দু-মুসলিম মিলনের আকাঙ্ক্ষা বোধ করতেন। আশালতা সেনগুপ্তাকে (কবি প্রদত্ত নাম প্রমীলা) বিয়ে এবং ধর্মান্তরিত না করা—এর চেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িকতার নজির আর কি হতে পারে? তবে হিন্দু মেয়ে বিবাহের কারণে দীর্ঘদিন কবিকে অনেক কটাক্ষ সহ্য করতে হয়েছে। এমতাবস্থায় তিনি লিখলেন,  ‘সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা কন আড়ি চাচা!/যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!/মৌ-লোভী যত মৌলভী আর মোল-লারা কন হাত নেড়ে/দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে।/ফতোয়া দিলাম কাফের কাজী ও/যদিও শহীদ হইতে রাজী ও।’

শুধু কি তাই! সন্তানদের নামও রাখেন হিন্দুয়ানি-মুসলমানি নামের সমন্বয় করে। যেমন প্রথম পুত্রের নাম কৃষ্ণ মোহাম্মদ, দ্বিতীয় পুত্র অরিন্দম খালেদ, তৃতীয় পুত্র সব্যসাচী ইসলাম এবং চতুর্থ জনের নাম অনিরুদ্ধ ইসলাম। নজরুল বাস্তবে কতটা অসাম্প্রদায়িক ছিলেন—তা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। 

কলকাতা এলবার্ট হলে ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর সমগ্র বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ‘জাতীয় কবি’ সম্মানে সংবর্ধিত করার জবাবে কবি বলেছিলেন, ‘আমি মাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি। গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।’

ওই অনুষ্ঠানে সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, ‘আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাব তখন সেখানে নজরুলের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাব তখনও তার গান গাইব।’ সেদিন সভাপতির ভাষণে প্রফুলচন্দ্র রায় বলেছিলেন, ‘ফরাসি বিপ্লবের সময়কার কথা একখানি বইতে সেদিন পড়িতেছিলাম। তাহাতে লেখা দেখিলাম সে সময় প্রত্যেক মানুষ অতি মানুষে পরিণত হইয়াছিল। আমার বিশ্বাস, নজরুল ইসলামের কবিতা পাঠে আমাদের ভাবী বংশধররা এক একটি অতি মানুষে পরিণত হইবে।’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় নজরুলের ক্ষুরধার লেখনী মানুষের মনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। নজরুলের বিপ্লবী চেতনা পরাধীন ভারতে স্বাধীকার চেতনার স্ফূরণ ঘটালো। নজরুল ভারতবাসীকে জেগে ওঠার আহ্বান জানালেন, ‘দেব-শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি/ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?’

বিদেশি, বিজাতি, বিভাষী ব্রিটিশ শাসন-শোষণ থেকে স্বদেশের স্বাধীনতা অর্জন ছিল তার মূল লক্ষ্য। তাই তিনি ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য করে লিখলেন, ‘এ দেশ ছাড়বি কি না বল?/নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।’ অন্যদিকে হিন্দু-মুসলিম কুসংস্কারপূর্ণ মানুষের সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন। তাই তিনি বললেন, ‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? —প্রলয় নতুন সৃজন-বেদন/আসছে নবীন— জীবনহারা অসুন্দরের করতে ছেদন।’ ‘ভাঙার গান’ কবিতায় কবির শৃঙ্খল মুক্তির প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট/ভেঙে ফেল কররে লোপাট/রক্ত জমাট/শিকল-পুজোর পাষাণ-বেদী!’ অন্যত্র বলেছেন, ‘মোদের প্রাপ্য আদায় করিব, কবজি শক্ত কর/গড়ার হাতুরি ধরেছি, এবার ভাঙার হাতুরি ধর।’

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক 
prithwish_chak81@yahoo.com

পিডিএসও/হেলাল