ছোটগল্প

দৈত্য ও আমাদের বন্ধুরাজা

প্রকাশ | ২৫ আগস্ট ২০১৮, ১৪:৫৩

ফখরুল হাসান

স্কুল ছুটি। মা, বাবা আর আমি নানুবাড়িতে বেড়াতে গেলাম। নানু আমাকে পেয়ে ভীষণ খুশি। রাতের খাবার শেষ করে নানুর রুমে গিয়ে নানুর কাছে গল্প শুনতে চাইলাম। নানু সব সময় আমাকে রাজকুমার, রাজকুমারী, রাক্ষসী আর পরিদের গল্প শোনাতেন। কিন্তু, আজ আমি নানুর কাছে অন্য কোনো গল্প শুনতে চাইলাম। নানু বলল, ঠিক আছে। আজকে তাহলে ‘দৈত্য ও আমাদের বন্ধুরাজার’ গল্প শোনাচ্ছি।

আমি খুব মনোযোগ দিয়ে নানুর গল্প শুনতে লাগলাম। নানু বলতে শুরু করলেন। স্বপ্নপুর নামের এক রাজ্য ছিল, সে রাজ্যটি দৈত্যরাজের দখলে ছিল। দৈত্যরাজ, স্বপ্নপুরের প্রজাদের নিজের গোলাম বানিয়ে রেখেছিল। দৈত্যরাজের বদল হয়। কিন্তু স্বপ্নপুরের প্রজাদের ভাগ্য বদল হয় না! সব দৈত্যরাজ স্বপ্নপুরের জন্য একই নীতি বজায় রাখে। কৌশলে প্রজাদের সমস্ত অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করে রাখে। নতুন দৈত্য রাজ্যভার গ্রহণ করল। প্রজারা মনে করল, এবার হয়তো তাদের আশা কিছুটা হলেও পূর্ণ হবে। কিন্তু না, কিছুদিন যেতে না যেতেই স্বপ্নপুরের প্রজাদের ওপর নেমে আসে নতুন বিপদ।

নতুন দৈত্যরাজ ঘোষণা দেন, স্বপ্নপুরের বাসিন্দাদের দৈত্যদের ভাষায় কথা বলতে হবে। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে যারা, তাদের কয়েকজনকে রাক্ষসরা মেরে ফেলে। দৈত্যরাজের ঘোষণা অমান্য করেছে বলে বাকিদের বন্দি করে রাক্ষসপুরীর অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করে। দৈত্যরাজের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে স্বপ্নপুরের প্রজাকুল অপেক্ষা করতে থাকে—কোনো রাজকুমার এসে তাদের স্বপ্নপুরকে, দৈত্যরাজের হাত থেকে মুক্ত করবে।

এভাবে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ যায়। স্বপ্নপুুরের প্রজাদের দৈন্যদশা কমে না, বরং বাড়তে থাকে। প্রজারা নিজের মুক্তির পথ খুঁজতে থাকে। কিন্তু কেউ তখনো জানত না যে, এই স্বপ্নপুরের প্রজাদের আলোর দিশা দেখাতে জন্ম নিয়েছে এক রাখাল রাজা। যে রাখালরাজা অল্প বয়সেই ভাবতে শুরু করে স্বপ্নপুরের অসহায় প্রজাদের কথা। তারপর একদিন স্বপ্নপুরের সেই রাখালরাজাই প্রজাদের মুক্তির মন্ত্র শোনান। তাদের বোঝান, সব প্রজা এক হলে, দৈত্যরাজের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব। অত্যাচারী দৈত্যকে বন্দি করা সম্ভব। স্বপ্নপুর থেকে দৈত্যদের তাড়িয়ে দিতে রাত-দিন পথ খোঁজেন রাখালরাজা।

তিনি তার পুরোটা জীবন স্বপ্নপুরের প্রজাদের কল্যাণে ব্যয় করেন। স্বপ্নপুরের মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘বন্ধুরাজা’। সেই বন্ধুরাজা স্বপ্নপুরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, দৈত্যদের হাত থেকে স্বপ্নপুরকে মুক্ত করতে, শুরু করেন যুদ্ধ। সে কি তুমুল যুদ্ধ! মাতৃভূমি স্বপ্নপুরকে দৈত্যমুক্ত করতে সেই যুদ্ধে অকাতরে প্রাণ দেন স্বপ্নপুরের সাহসী প্রজারা। অল্প কয়েকদিনেই দৈত্যরা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে রাক্ষসপুরীতে পালিয়ে যায়। এরপর সবাই সুখে-শান্তিতে বাস করতে থাকে।

সবাই মিলে চেষ্টা করতে থাকে—কীভাবে স্বপ্নপুরকে আরো উন্নত রাজ্যে পরিণত করা যায়। বন্ধুরাজা যখন তার প্রজাদের নিয়ে, স্বপ্নপুর সাজাতে ব্যস্ত, ঠিক সে সময়, একদল দৈত্য তাকে মেরে ফেলল। এটুকু বলেই নানু চুপ হয়ে গেলেন! খেয়াল করলাম, নানুর চোখে জল! আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমার মনে ঘুরেফিরে একটিই প্রশ্ন, গল্প বলতে গিয়ে, নানুর চোখে জল কেন? যতই নানুকে জিজ্ঞেস করি, নানু, তুমি কাঁদছ কেন? ততই যেন নানুর চোখের জল উপচে পড়ে। আমি নানুকে জড়িয়ে ধরে বুঝতে চেষ্টা করি—কেন নানু কাঁদছে...

পিডিএসও/তাজ