অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ার পর

প্রকাশ | ১৮ আগস্ট ২০১৮, ১৪:৪৭

ফকির ইলিয়াস

শেখ মুজিব ভোগবাদী নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন, ত্যাগী রাজনীতিবিদ। কিন্তু দেখে যেতে পারেননি তার ত্যাগে গড়া বাংলাদেশের সুখ-সমৃদ্ধি। তার জীবনটা অসমাপ্তই থেকে গেছে। তারপরও তিনি বীজ বুনে গেছেন। স্বপ্ন দেখিয়েছেন। করেছেন একটি মহান কাজ। তিনি বাঙালি জাতিকে একটি রাষ্ট্র দিয়ে গেছেন। এই জাতিসত্তাকে দিয়েছেন আত্মপরিচয়ের সন্ধান।

বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম না নিলে পাকিস্তানের গোলামির শিকল থেকে বাঙালিরা মুক্তি পেত কি না, সেই প্রশ্ন আরো হাজার বছর পরও উঠবে। আর সেজন্যই তিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের আলোর দিশারী।

তার লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি পড়ে আমরা জেনেছি অনেক ইতিকথা। তিনি ছিলেন একজন মননশীল পাঠকও। নিজ দেশেরই কিছু সেনাসদস্যের হাতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ যে ভোরে তিনি নিহত হলেন তার ঠিক আগের রাতেও তিনি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পড়ছিলেন বার্নার্ড শ’র ‘মানব এবং অতিমানব’ বইটি। তিনি কেবল পড়তেনই না, সমস্ত বিশ্বের নামজাদা সব লেখক, দার্শনিক, রাজনীতিবিদদের মনের ভেতরে উচ্চসম্মানের আসনে রাখতেন। ভালোবাসতেন বার্ট্রান্ড রাসেল, আব্রাহাম লিঙ্কন, উইন্সটন চার্চিল আর মহাত্মা গান্ধীর লেখা। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে গেলে আজ আমরা দেখি তার গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা গড়ে তুলতে কী বিপুল পড়াশোনা ছিল তার! এটা আমাদের জন্য খুব আশ্চর্যের এবং দুর্ভাগ্যের হতো, যদি আমরা আমাদের এই মহান নেতার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতার কোনো স্বহস্তে লিখিত দলিল না পেতাম।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি লেখা হয় জেলখানায় বসে, ’৬০-এর দশকের শেষের দিকে, এমন একটা সময়ে যখন শেখ মুজিব পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। আর এর রাজনৈতিক গুরুত্ব এতোটাই, যা ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজনীতিকে খুব কাছ থেকে দেখা একজন মানুষের বয়ান। সেই সময়ের পাকিস্তানের কথাই এখানে উঠে এসেছে, যখন একটা গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে এর গড়ে ওঠার সমস্ত সম্ভাবনা ধীরে ধীরে মুছে দেয়া হচ্ছিল।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী, বইটির নামেই উল্লিখিত এটি বঙ্গবন্ধুর পূর্ণ জীবনী নয়, বরং এর মাঝে আমরা আমাদের জাতির পিতার জীবনের একটি অংশই পাবো কেবল। কিভাবে তিনি বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠলেন, কিভাবে নেতৃত্ব দিলেন বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের তার উল্লেখ এই বইয়ে নেই, এ বইটি বঙ্গবন্ধুর একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে গড়ে ওঠার ইতিহাস। চল্লিশের দশকের শুরুতে অন্য অনেকের মতোই শেখ মুজিবুর রহমান সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগের সমর্থন দেন, যাদের রাজনীতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতের মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রভাবে অনেকটা অবধারিতভাবে শেখ মুজিব জড়িয়ে পড়েন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে। অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দীর ছায়ায় তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিনগুলোর কথা মনে করেছেন। কিভাবে তখন শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতার জন্য মানুষ মানুষকে হত্যা করছিল। কলকাতা থেকে পাটনা গিয়ে দেখেন, সেখানেও একই অবস্থা। আমরা দেখতে পারি এতো ঝড়-ঝঞ্ঝা, রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই এতো ধাক্কার পরও শেখ মুজিবের সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা এতোটুকুও কমেনি কখনই। ১৯৬৩-এর শেষদিকে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত বলা যায় তিনি ছিলেন একজন নিবেদিত এবং সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী। জিন্নাহর প্রতি শেখ মুজিবের শ্রদ্ধার নিদর্শন পেলেও, পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী খানের প্রতি তার মনোভাব ছিল প্রত্যাশিত। শেখ মুজিবের বুঝতে দেরি হয়নি এই উদ্ধৃত রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক বাস্তবতায় অজ্ঞতার কথা। ১৯৪৯ সালে, যে বছর কিছু অসন্তুষ্ট বাঙালি মুসলিম লীগ নেতা আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত করেন, লিয়াকত ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী মুসলিম লীগ কী, তা তিনি জানেনই না!

সেই ১৯৪৯ সালেই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন দিকের সূত্রপাত ঘটে, যেসব দিক পরবর্তী বছরগুলোতে তার জীবনে অবিচ্ছিন্ন অংশ হয়ে থাকবে। পুলিশ ক্রমাগত তার পিছে লেগে থাকে; সরকার আওয়ামী মুসলিম লীগের ওপর আরোপ করে কড়া বিধিনিষেধ। এক পর্যায়ে পুলিশ যখন মওলানা ভাসানী এবং শামসুল হকের ওপর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে, ভাসানী মুজিবকে বলেন, পুলিশের কাছ থেকে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে। তিনি শেখ মুজিবকে আরো বলেন, লাহোরে গিয়ে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে আলাপে বসার জন্য। শেখ মুজিব মাত্র দুই রুপি সঙ্গে নিয়ে লাহোরে যান এবং গিয়ে দেখেন সোহরাওয়ার্দী সেখানে নেই, ফিরবেনও না আরো কিছু দিন। শেষ পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী ফিরলে মুজিব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। তার প্রিয় নেতা লাহোরের তীব্র শীতে কাঁপতে থাকা মুজিবকে গরম কাপড় দেন পরার জন্য।

এরপর ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুজিব যুক্তফ্রন্টের হয়ে অংশ নেন। যুক্তফ্রন্ট নুরুল আমিনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে হারায়। যদিও যুক্তফ্রন্ট সরকার বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ঠিক যেদিন শেখ মুজিব কেবিনেটে যোগ দেন, ঠিক সেদিনই কেন্দ্রীয় সরকারের মদদে আদমজী জুটমিলে হত্যা করা হয় কমপক্ষে পাঁচশ জন বাঙালি ও অবাঙালিকে। কিছুদিন পর বিশেষ আইন জারি করে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করা হয়। কোনো মন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রী প্রতিবাদে একটা কথা বললেন না। মন্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র শেখ মুজিবই গ্রেফতার হন।

এভাবেই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের অনেক খুঁটিনাটি বর্ণনা বইটি জুড়ে। আছে অসংখ্য মানুষের পরিচয়, মুজিবের প্রাথমিক রাজনৈতিক ভাবনা, সবকিছুই এক সুখপাঠ্য ভাষা ভঙ্গিতে। বইটা পড়ে শেষ করবার পরই যে কারো মনে হবে, যদি শেখ মুজিব তার জীবনের পুরোটুকুই লিখে যেতে পারতেন! সত্যিই এই মহান রাজনীতিকের জীবনের তুলনায় বড় বেশি ক্ষুদ্র এর আয়তন। তবু আমরা এ গ্রন্থে পাই এই মহান নেতার এক তরুণ রাজনীতিবিদ থেকে একজন জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার পেছনের গল্প। বইটির ভূমিকা লিখে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন ধর্মভীরু নেতা। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীমূলক বইতে তার ইসলামপ্রিয়তা সম্পর্কে বেশ তথ্য পাওয়া যায়। ভাসানীর সঙ্গে এক জেলে থাকার বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘মওলানা সাহেবের সঙ্গে আমরা তিনজনই নামাজ পড়তাম। মওলানা সাহেব মাগরিবের নামাজের পরে কুরআন মজিদের অর্থ করে আমাদের বোঝাতেন। রোজই এটা আমাদের জন্য বাঁধা নিয়ম ছিল’। জেল জীবনের সময়-পার সম্পর্কে বলেন, ‘আমি তখন নামাজ পড়তাম এবং কুরআন তেলাওয়াত করতাম রোজ। কুরআন শরিফের বাংলা তর্জমাও কয়েক খণ্ড ছিল আমার কাছে’।

তার রাজনৈতিক দর্শন ছিল সম্প্রীতির। আন্দোলন সংগ্রামে তার সহযোদ্ধা, প্রতিপক্ষ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বস্তুনিষ্ঠ প্রশংসা ও সমালোচনা করেছেন তিনি বইটিতে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তানের জন্ম এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বিমাতাসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মওলানা ভাসানী ও শেরে বাংলা ফজলুল হকের অবদানকে তুলে ধরার পাশাপাশি সময় সময় তাদের দুর্বল চিত্ত, দোদুল্যমান মনোভাব এবং যুক্তফ্রন্টে নেতৃত্ব দানে ব্যর্থ হওয়ার সমালোচনা করেছেন। অপরপক্ষে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদার, ত্যাগী, অসাম্প্রদায়িক নেতৃত্বকে বাহবা দিলেও তার অতি উদারতাকে খাজা নাজিমুদ্দীন গংদের নেতৃত্বে আসার অন্যতম ‘সুযোগ’ হিসেবে দেখিয়েছেন (১৯৩৭-এর নির্বাচনে শহীদ সাহেবের সিটে উপ-নির্বাচনের মাধ্যমে নাজিমুদ্দীনকে জেতানো হয়)। তার মতে ‘উদারতা দরকার, কিন্তু নীচ অন্তঃকরণের ব্যক্তিদের সঙ্গে উদারতা দেখালে ভবিষ্যতে ভালোর চেয়ে মন্দই বেশি হয়।’ খান আতাউর রহমান, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, ইয়ার মোহাম্মদ খান, ফজলুল কাদের চৌধুরী, শামছুল হক সাহেব, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ সহযোদ্ধাদের অবদান বইয়ের পৃষ্ঠায় বারবার এসেছে। আজকের এই বাংলাদেশ গড়ে উঠতে যে পথপরিক্রমা পার হতে হয়েছে, তার বর্ণনা আছে শেখ মুজিবের জবানীতে।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক
সদস্য, আমেরিকান ইমেজ প্রেস
oronik@aol.com 

পিডিএসও/হেলাল