হুমায়ূন ছিলেন বলেই গল্পটা বদলে গেল

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৮, ১০:৪৯ | আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৮, ১১:১১

সোহেল নওরোজ
হুমায়ূন আহমেদ, ছবি : শাকুর মজিদ

একটা গল্প নিয়ে বসে আছি। গলায় কাঁটা আটকে যাওয়ার মতো গল্পটা বিঁধে আছে, খুব ভোগাচ্ছে। কূল-কিনারা নির্ধারণ করতে পারছি না। বিষফোঁড়ার অনেকগুলো মুখের মতো গল্পটারও বেশ কয়েকটি মুখ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। একটা সুন্দর পরিণতির জন্য কোন পথ বেছে নেব, তা নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ কব্জায় রাখতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে চুপচাপ বসে অপেক্ষা করাই শ্রেয়। একসময় হয়তো গল্পের পাত্র-পাত্রীরাই সমাধান বাতলে দেবে, কিংবা গল্পটাই বদলে যাবে। আগের গল্পের পুরোটাই প্রতিস্থাপিত হয়ে নতুন রূপ ধারণ করবে। পাত্র-পাত্রীরা নতুন নাম নিয়ে নয়া সাজে হাজির হবে। আমার ক্ষেত্রে তার কোনোটাই হচ্ছে না। এটা শুভ লক্ষণ নয়। আকাশে ওড়া ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো ইতস্তত গল্পটার সুতো ছেড়ে দিয়েছি, নাটাই পুরোটা হাতে আছে কি না, তাও বুঝতে পারছি না।

একটু পেছনে ফিরে যাই। গল্পের মূল চরিত্র রূপা। এ নামটা আমাকে এতটাই মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, আর কোনো নাম এতটা দাবি নিয়ে মস্তিষ্কে উপস্থিতি জানান দেয়নি। রূপার কাছে মলিন অন্য সব নাম নিয়ে অহেতুক ভাবনা বাদ দিয়ে গল্পে মনোযোগ দিই। সচরাচর গ্রাম্য মেয়েরা যেমন হয় এ মেয়েটা তেমন নয়। গল্পটা তাই একটা দুঃখী মেয়ের, যে সুখ লালন করতে জানে। যার গায়ের রং চাপা বলেই নামটা তুলনামূলক কম মূল্যের ধাতুর নামে রাখা হয়েছে, তা না হলে হয়তো হীরা বা মুক্তা রাখা হতো। এমন একটা মেয়ের সঙ্গে সাত বছর আগে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। বেসরকারি সংস্থার কাজে গ্রামের একটা মেয়েকে প্রয়োজন ছিল। ভাইভা বোর্ডের আরো তিন সদস্যের সঙ্গে আমিও বসেছিলাম। সাকুল্যে বারো-তেরোজন মেয়ে উপস্থিত হয়। রূপা ছাড়া তাদের আর কাউকেই আমার উপযুক্ত মনে হয়নি। ভেবেছিলাম আমার পছন্দের সঙ্গে বাকিদের মত মিলে যাবে। কিন্তু দেখার চোখের ভিন্নতার কারণেই রূপা চলে যায় তিন নম্বরে। তাকে এক নম্বরে আনতে আমাকে কম যুদ্ধ করতে হয়নি। শেষমেশ সফল হয়েছিলাম বলেই মেয়েটাকে জানার সুযোগ হয়েছিল। কাজ করতে গিয়ে বাকিরাও চমকে গিয়েছিল রূপার বিচক্ষণতায়। আমাকে অবাক করেছিল ওর জীবনের গল্প। আজকের গল্পে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সেদিনের সেই শ্যামলা মেয়েটির প্রভাব টের পাচ্ছি। দুঃখী মেয়েটির একটা ভালো পরিণতির দায় আমার ওপর এসে পড়েছে। অথচ, যতদূর জানি, গল্পকারকে থাকতে হয় নির্মোহ। আমি তা পারছি না। পারছি না বলেই গল্পটা এগোচ্ছে না।

রূপার আর কোনো ভাই-বোন নেই। বাবা ময়েনউদ্দীন অনেকদিন থেকেই অক্ষম। এক বর্ষায় গাছ থেকে পড়ে গিয়ে দু’পায়ের শক্তি হারিয়েছে। পায়ের সঙ্গে মাথাটাও কিঞ্চিৎ বিগড়ে গেছে। রূপার মাকে যখন-তখন ধমকা-ধমকি করে। বিষয় যত তুচ্ছই হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। শ্রাবণের এক সন্ধ্যায় রূপা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসেছে। ঠিক তখন রূপার মা মনোয়ারা চুপিচুপি স্বামীর কাছে এসে বসে। হয়তো এমন মায়াবী সন্ধ্যায় দীর্ঘকাল আদর না পাওয়া তৃষ্ণার্ত মনটাতে একটু প্রলেপ দিতেই স্বামীর সঙ্গে আলাপ জুড়ে দেয়। দু-চার কথার পরই ময়েনউদ্দীন উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। প্রথম দিকে মনোয়ারা তা থামানোর চেষ্টা করলেও একসময় তার ভেতর থেকে সহিষ্ণুতা হারিয়ে যায়। শাড়ির আঁচল দিয়ে ময়েনউদ্দীনের অপুষ্ট গলাটা পেঁচিয়ে কিছুক্ষণ চেপে ধরে। অল্পক্ষণেই তার প্রতিরোধ শেষ হয়ে যায়। রূপা ছুটে এসে তার বাবার নিথর দেহটাতে হাত রাখে। ঘটনা বুঝতে অসুবিধা হয় না তার।


কাকতালীয়ভাবে হুমায়ূন আহমেদের ভাবনার সঙ্গে তার জীবনের গল্প মিলে গেছে! ও এখন একটা বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মা মারা গেছে বেশ আগে। ফয়সালও অন্য একজনকে বিয়ে করে থিতু হয়েছে। কেবল তার আর সংসার করা হয়ে ওঠা হয়নি। সেদিন একটা প্রশ্ন না করে পারিনি, ‘এক জীবনে এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি আর সাহস কোথায় পেয়েছিলে?’


এখানেই হয়তো এলোমেলো হয়ে যেতে পারত সব। খেই হারিয়ে যেত দুটি জীবনের। কিন্তু এ গল্প গতানুগতিক নয়। ময়েনউদ্দীনের মৃত্যুটাই তাদের জন্য নতুন শুরুর উপলক্ষ্য হয়ে আসে। মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায় রূপা। বাবার মৃত্যুটাকেও নিছক ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ প্রমাণ করে সে। ভেঙে পড়া মায়ের কাছে অপরাধবোধের চেয়ে দায়িত্ববোধের পাল্লাটা ভারী করে তোলে। নিজের পড়ালেখা বন্ধ না করার নতুন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। মনোয়ারা কাজ নেয় চেয়ারম্যানের বাড়িতে। নাটক-সিনেমায় আমরা যেমন চেয়ারম্যান দেখে অভ্যস্ত ইনি তার একেবারেই ব্যতিক্রম। ভালো মানুষের উদাহরণ দিতে গেলে গ্রামবাসীর মুখে তার নামটাই সবার আগে আসে। চেয়ারম্যানের দুই বউ। ছোট বউয়ের দেখভাল করার দায়িত্ব পড়ে মনোয়ারার। অল্প দিনেই মনোয়ারা তার আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। কোনো কারণে একদিন যেতে না পারলে তার বাড়িতেই চেয়ারম্যানের বউ ছুটে আসে। রূপার লেখাপড়ার একটা বড় খরচও জোগায় সে।

প্রকৃতির নিয়মের বাইরে গিয়ে ঘুচে যাওয়া বিভেদ সবসময় ভালো ফল বয়ে আনে না। এ ক্ষেত্রেও তাই হলো। চেয়ারম্যানের বাড়িতে টুকটাক যাওয়া-আসা ছিল রূপার। সেটাই নানা অজুহাতে একসময় বাড়তে লাগল। কেউ কেউ বিষয়টা খেয়াল করলেও পাত্তা দিতে চাইত না। তাছাড়া নিজের এমনই গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছিল যে রূপাকে অপবাদ দেওয়ার সাহস গ্রামের কারো ছিল না। দৃশ্যপটে চেয়ারম্যানপুত্র ফয়সাল না এলে সে বিশ্বাসের ব্যত্যয় ঘটত না। কিন্তু কী এক অদৃশ্য ভালোলাগায় সব বিশ্বাস, আস্থা আর ধারণার দেয়াল ভেঙে যায়। মানুষ থেকে তারা দুজন পাখি হয়ে ওঠে। মুখের চেয়ে চোখের ভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে বোঝাপড়ার সেতুটা মজবুত করে তোলে। যার ওপর দাঁড়িয়ে হাজারো সংকোচ আর দ্বিধা নিয়ে একে-অন্যকে বলে দেয়—‘ভালোবাসি!’

প্রণয়কে পরিণতি দিতে ফয়সালের তাড়া ছিল, রূপা এ বিষয়ে আগের মতোই ধীর স্থির। কেবল ভেতরের তাড়নাকে প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া। একটা চাকরির জন্য সে তখন হন্যে হয়ে উঠেছে। নিজেদের পরিচয় বদলানো না গেলেও অবস্থান এবং অবস্থার কিঞ্চিৎ বদলাতে চাকরিটার বড্ড প্রয়োজন ছিল রূপার। ঠিক সে সময় রূপার সঙ্গে আমার বা আমাদের পরিচয়। ওর চোখে-মুখে তখন অন্য এক আগুন। যে আগুন বাকিরা না দেখতে পেলেও আমি ঠিকই দেখেছিলাম। কাজের ফাঁকে একদিন ওর সঙ্গে কথা হয়েছিল। জীবনের কথা। ওই-ই প্রথম পেড়েছিল প্রসঙ্গটা।

‘আমার চাকরিটা স্থায়ী করা যায় না স্যার?’

‘সে সুযোগ থাকলে তোমাকে বলতে হতো না। এ কয়দিনে আমি বেশ বুঝেছি চাকরিটা তোমার কত প্রয়োজন। কিন্তু গ্রামের মেয়েরা তো সাধারণত চাকরি করতে চায় না। তুমিই দেখি ব্যতিক্রম।’

‘এ ছাড়া আমার যে আর কোনো উপায় নেই!’

‘কেন?’

বোকার মতো আমার এ প্রশ্ন ওকে আশাহত করে। উত্তর না পেয়ে আমিও প্রসঙ্গ ধরে থাকি না। কথার গতিপথ বদলাই। ওদের গ্রাম ছেড়ে আসার আগের দিন আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দেয়। মুখে বলতে না পারা কথাগুলোই তাতে লেখা। ফিরে এসে যখন রূপার জীবনের কথা লেখা কাগজ খুলে বসেছি, বিস্ময়ের মাত্রা ক্রমশই বেড়ে চলেছে। খুব ইচ্ছে ছিল ওর জন্য কিছু একটা করার। সে সুযোগ আর আসেনি। লোভনীয় একটা সুযোগ পেয়ে দুই মাসের জন্য আমাকে দেশের বাইরে যেতে হয়। ফিরে এসে কী এক সংকোচে কিংবা এরই মধ্যে অনাকাক্সিক্ষত কিছু ঘটে যাওয়ার ভয়ে আর ওর মুখোমুখি হতে পারিনি। অধিকাংশ ‘না পারা’ মানুষ যেমন নিজেদের অক্ষমতা আর দুর্বলতা ঢাকতে খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসে, আমিও তেমনি কল্পনার আশ্রয় নিয়ে রূপার সার্থক পরিণতি খুঁজতে গল্পের আশ্রয় নিয়েছি।

রূপাকে আজ পালিয়ে যেতে হবে। গল্পের দাবি এরকমই। এ ছাড়া ফয়সালের সঙ্গে মিলনের আর কোনো পথ নেই। তারপর কী হবে? ফয়সাল ঠিক আসবে তো? নাকি প্রেম ছাপিয়ে বাবার সম্মান আর আত্মমর্যাদা বড় হয়ে উঠবে! রূপার অশ্রুতেই ঘটবে সমাপ্তি? আমি তা হতে দেব কেন? রূপাকে লালের বদলে সবুজ শাড়ি পরাব। সবাইকে লাল রঙে মানায় না। সবুজেই ওকে সবচেয়ে ভালো মানাবে। ফয়সালের গায়ে থাকবে মেরুন পাঞ্জাবি। হাতে থাকবে গাছ থেকে সদ্য পাড়া বর্ষাসিক্ত কদম। বিয়ের পর রূপার হাতে একগুচ্ছ কদম তুলে দেবে। তা থেকে টপটপ করে বর্ষার জল পড়তে থাকবে। ওদিকে রূপার চোখেও তখন হয়তো চিকচিক করবে অশ্রু, সোনালি অশ্রু।

পুনশ্চ : আমার গল্পটা এভাবে শেষ হয়নি। সেটা রূপা বা ফয়সালের জন্য নয়। হুমায়ূন আহমেদের জন্য। যার মাধ্যমেই রূপাকে চিনেছি। এ নামটা তার ছোঁয়াতেই এমন প্রভাব আর ঐশ্বর্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। আমার চেয়ে রূপার পরিণতি ঠিক করার অধিকার তারই বেশি। অগত্যা তিনিই এসে বদলে দিলেন গল্পটা। পরিণতিতে চমকে গেলাম আমিও। গল্পটা হয়ে উঠল আনন্দময় বিষাদমাখা। পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল দুজনেরই। ফয়সাল গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রঙিন পাঞ্জাবি পরা ফয়সালকে নিরাশ হতে হয়। কারণ, রূপা সেখানে যায় না, যেতে পারে না। সবসময় ভালোবাসা একভাবে জয়ী হয় না। কিংবা আবেগকে সংবরণ করার মধ্যেই হয়তো প্রেম তার চূড়ান্ত রূপ পায়, আরও শাশ্বত হয়ে ওঠে। রূপা স্পষ্ট দেখতে পায়, তার এ সিদ্ধান্তে অন্তত অনুশোচনায় পুড়তে থাকে মনোয়ারাকে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করতে হবে না। রূপার মধ্যেই সে তার সাহস আর বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে নেবে। এ ভালোবাসার মূল্য কি কম?

ফুটনোট : এর অনেক দিন বাদে রূপার সঙ্গে সত্যিই আমার দেখা হয়ে যায়। কাকতালীয়ভাবে হুমায়ূন আহমেদের ভাবনার সঙ্গে তার জীবনের গল্প মিলে গেছে! ও এখন একটা বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মা মারা গেছে বেশ আগে। ফয়সালও অন্য একজনকে বিয়ে করে থিতু হয়েছে। কেবল তার আর সংসার করা হয়ে ওঠা হয়নি। সেদিন একটা প্রশ্ন না করে পারিনি, ‘এক জীবনে এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি আর সাহস কোথায় পেয়েছিলে?’ আমাকে আরেকবার বিস্ময়ের সাগরে ফেলে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি এনে জানিয়েছিল, ‘কেন হুমায়ূন আহমেদের রূপাদের চেন না? আমিও না হয় তাদের একজন!’

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গল্পকার
snawroz.bau@gmail.com

পিডিএসও/হেলাল