স্বল্প দৈর্ঘ্যের গল্পে ভাবনা বিশাল

প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০১৮, ১২:০৮ | আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৮, ১২:২৯

রহিমা আক্তার মৌ

পত্রিকার পাতায় প্রথম লেখা প্রকাশ হওয়ার আনন্দ যেন বিশ্বজয়ের মতো! শুধু কি লেখা, লেখার ওপরে বা নিচে ছাপার অক্ষরে নিজের নাম—এ এক অন্যরকম সুখ! মনে পড়ে সেই সুখ পেয়েছি আমিও ২০০৯ সালে। প্রথম ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখি ‘সাপ্তাহিক রোববার’-এ। সোহেল নওরোজ সে রকম সুখের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন ‘গল্প থেকে ভালোবাসা’ নামক অণুগল্পে। ছাপার অক্ষরের পত্রিকা সংগ্রহ করতে গিয়েছেন পত্রিকার স্টলে, সেখানে না পেয়ে পত্রিকা সংগ্রহে পঁচিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। যেতে যেতেই সেখানেও পত্রিকা শেষ। ভাবছেন, তবে কি তার গল্প আছে বলেই আজ পত্রিকা সংকট দেখা দিল! স্টলে পত্রিকা না পেলে কেমন কষ্ট হতে পারে তা বুঝতে বুঝতেও কাঙ্ক্ষিত পত্রিকা পেয়ে যান একসময়ের সহপাঠী ফারিহার কাছে। পত্রিকার পাবার সঙ্গে সঙ্গে খুঁজে পান ফারিহার চোখের ভাষাও। একসঙ্গে দুই পাওয়ার আনন্দ ভাষা হারায়।

বিভিন্ন সময়েই সমালোচনার ঝড় ওঠে আমাদের রেডিও এফএমগুলো নিয়ে। উচ্চারণে ভুল, বাংলিশ, সাধু-চলিত ভাষার মিশ্রণে চালিত হয় রেডিও এফএম চ্যানেলের উপস্থাপনা। ফাঁকতালে চলে বেতাল গান। গল্পকার সোহেল নওরোজ তার লেখা ‘মেঘবার্তা’ গল্পে সে বিষয় নিয়ে আসেন। ‘সবুজ পাতার ভালোবাসা’ গল্পে তিনি লিখেছেন, ‘সবুজ পাতার সঙ্গে সবুজ পাতা মিলতে পারে শুকনো পাতা নয়। আমি সবুজ পাতা হয়ে সুখের আলিঙ্গনে বাঁধতে পারিনি স্বপ্নাশ্রয়ী আরেক সবুজ পাতাকে। শুকনো পাতা হয়ে সবুজ পাতার ভালোবাসা ধরে রাখার অবাস্তব প্রয়াসও ব্যর্থ।’

কিছু গল্প থাকে ঘটনার বর্ণনায় মোড়া, সাহিত্যের ভাষায় আবৃত। সোহেল নওরোজের গল্পে সেই বর্ণনা ও ভাষা খুঁজে পেয়েছি। পেয়েছি গল্প লেখার স্বতন্ত্র এক কৌশল, যা নতুন গল্পকারদের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে। ‘জ্বর’ গল্পে গিয়ে কিছুক্ষণ নীরব হয়ে থাকি। জেরিন যা কেনে সবই দুটি করে, লেকচার সিট থেকে শুরু করে পাঞ্জাবিও। জেরিনের জন্যে কিনতে যাওয়া দুইটি থার্মোমিটার নিয়ে ফেরার পথে রিকসাওয়ালার জ্বরের কথা শুনে রিকশা থেকে নেমে একটা থার্মোমিটার দিয়ে তার জ্বর মাপে। পরে সেই থার্মোমিটার তাকে দিয়ে দেয়। এখানে এক অনন্য মানবতা প্রকাশ পায়। এই প্রকাশগুলো গল্পের আকারে তুলে আনা প্রয়োজন গল্পকারদের, ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা গল্পকারদের একটা দায়বোধ। মানবতার আরেকটা দিক উঠে এসেছে ‘চলো আনন্দ মাখি’ গল্পে।

বইটির প্রথম গল্প ‘যুগল ছবি’ পড়তে গিয়ে ভেবেছি হয়তো প্রেম-ভালোবাসা নিয়েই। কিন্তু পরক্ষণেই দেখি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘটনা। একটা ছবির জন্য, ছবির মানুষের জন্য রেবেকার অপেক্ষা যেন ফুরায় না! যুদ্ধ শেষে বোরহান ফিরে এসে স্টুডিওর নাম দেয় ‘মুক্তির আলো’। বিনে পয়সায় গ্রামের সবার মুক্তির হাসিমাখা ছবি তুলে দিচ্ছে, নিজেদের ছবিগুলো দেখেই সবাই মুক্তির আনন্দ উপভোগ করছে। কিন্তু রেবেকার ছবি তুলতে পারেনি, কারণ যুদ্ধ শেষে আফজাল এখনো আসেনি। হয়তো আফজাল ফিরবে, হয়তো ফিরবে না। রেবেকা-আফজালের যুগল ছবি তোলার অপেক্ষা যে বোরহানেরও! স্বাধীনতা যুদ্ধের আরেক ঘটনা তুলে ধরেছেন ‘সম্মোহন’ গল্পে। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর স্কুলের ‘শহীদ স্মরণ’ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি করা হয় আমিরুল হককে, যিনি নিষ্পাপ দুই পুত্রকে হারান মুক্তির সংগ্রামে।

‘তানিমের ফেসবুক ওয়াল ভরে উঠেছে গ্রামীণ আলোকচিত্রে। তবে একটা অ্যালবাম থেকে চোখ সরানো যাচ্ছে না। ছবিগুলোতে নুশরাতের চোখ-মুখ থেকে সোনালি আভা ঠিকরে পড়ছে। ক্যাপশনে তানিম লিখেছে, ‘ঠিক যেন রোদের মতো মেয়ে! এমন মেয়ে পাশে থাকলে এক জীবনে বেশি কিছু আর লাগে না।’ সত্যিই ভালোবাসা হয়তো এমনই, যাকে নিয়ে অনেক কিছু ভাবা যায়, জনম জনম পার করা যায়।

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুককে তিনি ‘মন খারাপের রাজধানী’ বলেছেন। নিজের পোস্টে যার একটি মাত্র লাইকের অপেক্ষায় থাকা হতো সেই যখন নেই, বারবার খুঁজেও যখন তাকে পাওয়া যাচ্ছে না তখন অন্যসব নামকে ফ্যাকাসে লাগছে। ‘তুমি আছো, তুমি নেই’ এমনই এক হাহাকারের গল্প। প্রিয় বন্ধু আনিলাকে কখনো কাঁদতে দেখেনি, শত যন্ত্রণা, শত অভিমানেও আনিলা কাঁদে না। ধরেই নিয়েছে আনিলাকে কখনোই কান্না ছোঁবে না। পরপর জন্মদিন ভুলে যাওয়ায় এবার যখন আনিলা নিমন্ত্রণ করেনি তখন ঠিকই মনে রেখেছে আনিলার জন্মদিনটাকে। নিজেই চকলেট আর কবিতার বই নিয়ে দাঁড়ায় আনিলার সামনে। আনন্দ যে অনেক সময় কান্নায় রূপান্তরিত হয়, সেদিন আনিলার তাই হয়েছে। আনিলার চোখে জল দেখে বলে উঠে, ‘আনিলা তুই কাঁদতেও পারিস! তোর কান্না এত মধুর হয় কেন রে?’ এভাবেই ‘কান্নাপর্ব’ গল্পটি আবেগঘন হয়ে ওঠে।

সোহেল নওরোজের ‘আবছায়া গোধূলিবেলায়’ পড়তে গিয়ে আকাশের সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা মনে পড়ে যায়। তিনি লিখেছেন, ‘যতবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছি ততবার অবাক হচ্ছি। কোনো এক অজানা কারণে আকাশের মন ভালো নেই। হেমন্তে এমন মলিন আকাশ সচরাচর দেখা যায় না। রোদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলার বদলে গ্রাম্য বালিকার মতো ছিঁচকাঁদুনে এ আকাশ আমায় টানছে না।’ ‘বেনামী চিঠি’ পড়তে গিয়ে ‘আকাশের ঠিকানায় চিঠি’ শিরোনামের লেখাটির কথা মনে পড়ে, যা পড়েছি একটি জাতীয় পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। চিঠি আর চিঠি। প্রেমিকার কাছে পাতার পর পাতা লিখে চলছেন প্রেমিক পুরুষটি। ততদিনে একশো পাতার মতো লেখা হয়ে গেছে। সংখ্যাটা মনে পড়তেই একটা সাদা কাগজের মাঝখানে পেন্সিল দিয়ে বড় একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে পাঠালেন প্রেমিকার কাছে। চিঠিতে লিখলেন, ‘এই, তুমি কি বুঝতে পারছ না আমাদের চিঠি চালাচালির বিষয়টা ভীষণ একপেশে হয়ে যাচ্ছে?’ ১৯২৬ সালে কিছুদিনের জন্য ভেরার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে ভেরার উপহার দেওয়া একটা নোটপ্যাডে নবোকভ লিখেছিলেন, ‘মাই ডার্লিং, আমিই বার্লিনের একমাত্র রাশান অভিবাসী যে তার স্ত্রীকে প্রতিদিন চিঠি লিখে।’ তবে ভেরার জন্য নবোকভ উদগ্রীব থাকলেও ভেরা ছিলেন অনেকটাই শান্ত, স্থির। দিমিত্রি নবোকভ, তাদের এই ছেলেটি বলেছেন, ‘আমার মা চুপচাপ স্বভাবের মানুষ ছিলেন। দুজনের অনেক চিঠি বিশেষ করে ভেরার লেখা চিঠিগুলো হারিয়ে গেছে।’ সোহেল নওরোজ ‘বেনামী চিঠি’তে লিখেছেন, ‘চিঠিকেন্দ্রিক ভালোবাসাগুলো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। সময় কত কিছুই বদলে দেয়, তা-ও নিষ্ঠুরভাবে।’ প্রেমিক বলেছিল প্রেমিকার মন ভালো রাখার সব দায়িত্ব নেবে, প্রেমিকা রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলেই কাঁঠালচাঁপার গন্ধ পায়, আর সঙ্গে সঙ্গেই মন ভালো হয়ে যায়। তাই প্রেমিকের কাছে চিঠি লিখে আবদার জানায়, ‘এই বর্ষাতেই তোমার শোবার ঘরের ঠিক জানালার পাশে একটা কাঁঠালচাঁপা গাছ লাগাও। তোমার ঘরের পাশে কেন লাগাতে বলছি তা নিশ্চই ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই!’ অথচ সেই চিঠি বেনামী হয়ে পড়ে থাকে পুরনো বইয়ের মাঝে।

ভালো থাকা নিয়ে কথা উঠলেই আমি বলি, সেক্রিফাইজের অন্য নাম ভালো থাকা। সোহেল নওরোজ তার ‘রুদ্ধস্বর’ গল্পে লিখেছেন, ‘সবচেয়ে মিথ্যা প্রত্যাশার নাম যে ‘ভালো থাকা’, তা কি অর্পা জানত না? সমাজ, সংসার আর কর্মক্ষেত্রের অনেক ছোট ছোট দিক তুলে ধরেন সোহেল নওরোজ তার দুই অপরাজিতা, মামা কাহিনী, দৌড়, স্বপ্ন বাড়ি যায়, জীবন পাড়ের বন্ধু, অসুখপাখি, ছায়াসঙ্গী, হাতপাখা, রং, হিমু অথবা রূপার গল্প’র মতো অনেক গল্পে। অল্প কথায় পাঠকের কাছে যেকোনো বিষয় সুচারুরূপে তুলে ধরতে পারাই গল্পকারের সাফল্য। সেজন্যই পাঠকও তাকে একজন উপযুক্ত গল্পকারের আসনে বসিয়েছেন।

পিডিএসও/হেলাল