করো ছিন্ন পৃথিবীর আকাশ

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০১৮, ১৫:৩৭ | আপডেট : ২৯ জুন ২০১৮, ১৬:০৩

যিয়াদ বিন সাঈদ

একদা প্রত্যুষে পৃথিবীর টলোমলো এ বক্ষে দাঁড়িয়ে আমি অপেক্ষমাণ এক প্রেমাস্পদ। আমার সমস্ত অস্তিত্বে খেলা করে প্রেম। দোলে সে প্রেম প্রতিক্ষণে এক অদ্ভুত মাদকতা নিয়ে। মাঝেমাঝে সে প্রেম জাগরুক। আবার কখনোসখনো এ প্রেম ভগ্নপ্রায় শরাব-পেয়ালার প্রণয়ভোজন। হৃদয়ে নীরবে ঘুম পাড়িয়ে রাখা এ প্রেম এখন চাইছে কী আসলে? পৃথিবীর এ মাস্তুল দহলিজে দাঁড়িয়ে থেকে তার প্রতীক্ষার এ ক্রমবৃদ্ধি, কোত্থেকে আসা তীব্র আকাঙ্ক্ষা কিবা স্বপ্ন তাকে আরো প্রতীক্ষিত করে তুলছে? সবকিছুর সঙ্গেই যেন জুড়ে দেওয়া যাচ্ছে বিস্মিতপ্রায় শব্দগুলো। মিলিয়ে দেওয়া যাচ্ছে শব্দের সে রিনিঝিনি অভিনব।

প্রতীক্ষা। সে তো কখনো সুললিত সুশ্রাব্য। আবার কোনো অবেলায় অশ্রাব্য আর মর্মভেদীও। এ বেলার প্রতীক্ষাটা কেমন তাহলে? ওইযে ভোরের একদম প্রারম্ভে জেগে ওঠা চড়ুই ছানাটি, সে যেমন করে করে যাচ্ছে কিচিরমিচির, আজকের প্রতীক্ষাটি কি অনেকটা এমন? এতটাই নরম আর চিত্তগ্রাহী? না। একদম না। বহু কোটি বছর তো প্রেমিকার শব্দহীন চলে যাওয়ার মতোই কেটে গেল। কেটে গেল সহস্র বসন্ত। কদমগুলো ফুটে উঠে মরে যাওয়ার আগেই থেমে গেল বাসন্তীপূজা। সব কিছু কেমন কেমন রুঢ় আর অসহ্য। কিন্তু তবুও কাটল না প্রতীক্ষা। প্রতীক্ষার এ গুঞ্জরণ, জাগরণ মনের ভেতর সকাল-সন্ধ্যা, সবকিছুকে নীরব আক্রোশ দূরে ঠেলে দিল। অথচ কাটল না এন্তেজারের এ আবদ্ধতা। পাষণ্ডতা।

প্রতিদিন ভোরেই আমি এখানে দাঁড়াই। ঠিক যে দিকটি দিয়ে প্রতিভাত হয় সোনা রঙের সূর্যটি, সে দিকেই বুক মেলে দিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকি। পৃথিবীর এ নাট্যমঞ্চে কত বিমূর্ত অভিনেতা করে যাচ্ছে অভিনয়, আমি সবই দেখি। আমি আরো দেখি, ওইযে উড়ে যাওয়া কাকটি, তার মুখে চিন্তার ঢেউ, কাকে সে খোঁজে? কাক যাকে খোঁজে, আমিও কি তাকে?

আমি তো খুঁজি সূর্যের ভেতরও এক অনন্য সূর্যকে। যে সূর্যটি সোনাঝরানো। যে সূর্যটি শান্তির রিসালা পাঠ করতে উদ্যত। ঝড়ের প্রকোপণ যার কাছে দৃঢ় করে স্থিরতার বার্তা। শুধুই বলে সে ‘শান্তি শান্তি’।

যে প্রভাতের বক্ষ হতে ছড়িয়ে পড়বে ফুটন্ত গোলাপ আর পুষ্পিত সবুজ, আমি খুঁজি সেরকমই এক সূর্য। অমনোযোগী শিশির টকটকে লালফুলকে যেভাবে জড়িয়ে ধরে, সে সূর্যকে আমি এমনই ভাবি, সে জড়িয়ে ধরছে শিশিরধৌত এক মানবফুল হয়ে আমাকে আর সমগ্র পৃথিবীর প্রতিটি অস্থিকোষকে।


দ্রোহের অনল বেয়ে প্রতি ভোরে সূর্যের এ রক্তচক্ষু যেন অন্তর্নিহিত কুলাঙ্গার। এই এখনি তেড়ে আসবে। তাই তো দাঁড়িয়ে আছি পৃথিবীর বুকে একটি নতুন সূর্যের প্রতীক্ষায়। বিদ্রোহের লালকোট পরে চিতাজ্বলা অন্ধকারের নিপাট শূন্যতা তাড়িয়ে দিয়ে আমি একবার চিৎকার করে বলতে চাই—‘জাগো জাগো মনুষ্যত্ব, আমাকে অন্ন দাও’


চন্দ্রনাথ যেদিন প্রণাম করে এলাম, ধূপ ধূনার গন্ধে ভরা সে মন্দির থেকেও শোনা গেল সেদিন সোয়ালোর কিচিরমিচির। বাঁশির প্রতিদ্বন্দ্বীও একবার খেলে গেলে আমার সমস্ত অস্তিত্বে। আমি নড়ে বসে ভাবতে থাকলাম—এই বুঝি প্রতীক্ষিত সে সূর্যটি উঠে যাবে। এই এখনি চোখ মেলে ছড়িয়ে দেবে স্বর্গীয় আলো। বিশুদ্ধ বর্ণচ্ছটার মনিমুক্তারাজিদের দেখা গেল তাদের লকলকে চোখ আরো উদগ্রীব। বাসনার সরু কুটুরীতে তারা এপাশ-ওপাশ করছে প্রতীক্ষার যন্ত্রণায়। কিন্তু সেদিনও দেখা গেল নিষ্প্রভ সে সূর্য। তবে কি ভস্মাধার পারে না পুনরায় প্রাণ সঞ্চার করতে? অবিসংবাদিত গণপিত্তবাদের করাল গ্রাসে আমাদের এ সূর্যটিও চুপসে গেছে?

যুগপৎ গণযুদ্ধের মহাক্রন্দন আমাদের বুকজুড়ে। আমাদের বুকজুড়ে হুতাশন। রক্তস্রোতের মস্তিষ্ক মজ্জার কুজ্ঝটিকায় এখন পৃথিবীতে প্রলয় প্রলয় ধ্বনি। যেন খুবলে খাচ্ছে প্রতিনিয়ত একটি কুকুর। দুইটি কুকুর। তিনটি কুকুর। মানচিত্রের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা সে কুকুরগুলোর চোখে এক অজানা লালসা। রক্তজয়ের জয়ধ্বনি আর বৈশ্বিক চিহ্নে অসভ্য উলঙ্গতা।

কোত্থেকে কোথায় দৌড়ে পালাব? ওইযে দেখা যায় বন্দি শিশু, করোটিতে যে রক্ততান্ত্রিক স্বৈরাচারের আঘাতে পিষ্ট। তাকে রেখে কি আমি দৌড়ে পালাব? কোথায়? কোন প্রান্তে? যেখানে আমি তাকাই, শুধু রক্তের স্রোত। চলছে ক্রমাগত। প্রবীণ প্রাবল্যতা নিয়ে সে রক্ত শুধু বয়েই যাচ্ছে।

এমনতর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দুর্গত নিয়তির আষ্টেপৃষ্ঠে যে মনুষ্যত্ব আমার মিশে গেছে, সে অস্তিত্ব কখনোই রক্তসূর্য ছাড়া আর কিছুই চোখে দেখে না। দেখে না রক্ত জলপ্রপাত কিংবা বিকৃত কৃতদাসত্বের সংগীতে কাফনের কঙ্কাল জয়ন্ত ছাড়া আর কিছুই। উচ্ছৃঙ্খল গণরক্তস্রোতে নিঃসীম দাঙ্গার অষ্টপ্রহর ছাড়া আর কিছুই তো দেখে না সে। বিবর্ণহীন দাসত্বই এ জীবনে আমার সবচাইতে বড় অর্জন। মহা অর্জন।

দিনশেষে ক্লান্ত গতরে বিমোচিত যখন শব্দের স্রোত, তখন এমনই এক সূর্যের প্রতীক্ষা করা ছাড়া আমার চোখে আর কোনো ইচ্ছে নেই। দ্রোহের অনল বেয়ে প্রতি ভোরে সূর্যের এ রক্তচক্ষু যেন অন্তর্নিহিত কুলাঙ্গার। এই এখনি তেড়ে আসবে। তাই তো দাঁড়িয়ে আছি পৃথিবীর বুকে একটি নতুন সূর্যের প্রতীক্ষায়। বিদ্রোহের লালকোট পরে চিতাজ্বলা অন্ধকারের নিপাট শূন্যতা তাড়িয়ে দিয়ে আমি একবার চিৎকার করে বলতে চাই—‘জাগো জাগো মনুষ্যত্ব, আমাকে অন্ন দাও।’

শান্তির জন্য আমি বুকে পোষা ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়ব প্রয়োজনে। দাঙ্গা-হাঙ্গামার বিরুদ্ধে আমি শেখাব সভ্যতার শির ঘ্রাণ কীভাবে শুঁখতে হয়। জ্ঞান দুর্ভিক্ষের ওপর এ অপদাঙ্গার আগুন কীভাবে নিভিয়ে দিতে হয়। কীভাবে ফিরে যেতে হয় পুরনো হেরেমে। রণডঙ্কা বাজিয়ে কীভাবে চলে যেতে হয় হারানো সূর্যের কাছে।

প্রতাহত কৃতদাসত্বের এ জীবনে তুমি হুট করে জেগে ওঠো হে হারানো সূর্য। ছড়াও তোমার চঞ্চল নৃত্যেরত ফুলের পাপড়িগুলি। ঝিরঝিরে বাতাসে, সমুদ্রতটে ঝকমকে ঢেউয়ের ফোকর দিয়ে হঠাৎ তুমি জেগে ওঠো। উচ্ছ্বল এ ফুলদল মাঝে তোমার শান্তির সে বিচ্ছুরণ কতটা প্রতীক্ষিত, তা কি জানো? ওঠো তাহলে, ওঠো। উপত্যকা আর পাহাড়ের সবুজগুচ্ছের ঠিক মাঝখান দিয়ে মেলে ধরো বক্ষ। অজস্র অশান্ত বুকে নামিয়ে আনো প্রশান্তির এক অদম্য কোলাহল।

পিডিএসও/হেলাল