আমিই সেই মেয়ে

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০১৮, ১৫:১৫ | আপডেট : ২৯ জুন ২০১৮, ১৫:২৯

শাম্মী তুলতুল

অস্থিরতা ভুবনজুড়ে কাজ করছে। রাতদিন জীবনটাকে আমি নিজেই নাড়াচাড়া করি। নিজেকে নিজেই প্রশ্নের মুখোমুখি করি। আর ধিক্কার দিই আমার জন্মকে। আমার শরীরের দুর্বলতা, অক্ষমতা এসব আমাকে চারদিক ঘিরে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। লোক জানবে না তাতে কী। মনের শান্তি বড় পাওয়া। সেই পাওয়া শরীর ও মন দুটোতেই যদি না থাকে বেঁচে থাকাই বৃথা। জীবনে সংসার করা তো দূরে, কাউকে ভালোবাসব সেই স্পর্ধাটুকুও আমার নেই। মানুষের সুখের সংসার, ছেলেপুলে দেখে নিজেই কাঁদি, নিজেই হাসি। নিজেকে হত্যা করার বহু চেষ্টা করেও বৃথা হয়েছি। পারিনি। কত কিছুই তো করলাম। সব চেষ্টাই বৃথা। ডাক্তার, কবিরাজ, তাবিজ-কবচ। কম না। শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস আমার সঙ্গী হওয়া ছাড়া আর কেউ থাকে না। আমিতো নিজেকে নিজের কাছ থেকে ধরে রাখি। কিন্তু প্রিয়ার কী হবে, তাকে কি ধরে রাখতে পারব? তাকে কীভাবে ধরে রাখব? কীভাবে সামাল দেব? ভাবনার আকাশে যখন উড়ু উড়ু, পাশ থেকে একটা ধাক্কা—
কি ব্যাপার? কি ভাবছ? অনেকক্ষণ ধরে তোমার তামাশা দেখছি। দূর থেকে এত করে ডাকলাম। বিড়বিড় করেই যাচ্ছ নিজে নিজে। কী অত বকবক করছ?
আরিফ চুপ। কথা বলতে তার একদম ইচ্ছে করছে না।
কিন্তু প্রিয়াতো নাছোড়বান্দা, কথা বলাবেই। আরে কী হলো। হ্যালো মিস্টার, আমাকে দেখছ না। চোখে কী হয়েছে তোমার?
কই কিছু না, এমনি।
এমনি! জলজ্যান্ত একটা মানুষ কত করে ডাকলাম। কাছে এসেও নাড়া দিলাম। আর তুমি বলছ এমনি।
হুম।
উহ তোমাকে নিয়ে আর পারি না। হা, হু এই শব্দগুলো ছাড়া আর কিছু শেখনি মনে হয়।
চলো,
কোথায়?
ঢং। কোথায় আবার ক্যানটিনে।
ক্যানটিনে আমার যেতে ভালো লাগে না।
আজব কথাতো, এটা সবার জন্য উন্মুক্ত, কারো বাপের না।
জানি। তবুও তোমার অন্য ডিপার্টমেন্টের বন্ধুদের আমার পছন্দ না।
আচ্ছা বাবা ঠিক আছে, তাহলে লাইব্রেরিতে চলো। তোমার কোনো ইচ্ছায় আমার বাধা নেই আরিফ।
আরিফ মনে মনে ভাবে, এটাই তো মহাসমস্যা। আমার প্রতিটা ব্যাপারে তোমার সায় দেওয়া, মেনে নেওয়া আমাকে খুব কষ্ট দেয়। কোনোভাবেই তোমাকে অবহেলা করতে পারি না। সুযোগ পায় না। কোনো সুযোগও রাখো না। প্রিয়া যখন আমার কাছে এসে বুক বরাবর দাঁড়ায়, নিঃশ্বাস ওঠানামা করে। ওর নিঃশ্বাসটাও আমি শুনতে পাই। মন চায় ওকে জাপটে ধরে আমার বুকের নরম লোমের মাঝখানে চেপে ধরি। সুযোগ পাই না, তা নয়। বরং আমি ওকে দূরে ঠেলে দিই। কাছে ঘেঁষতে দিই না। ও বুঝেও না বোঝার ভান করে। চেষ্টা আমাকে জয় করার। একদিন ওর কামিজের ভেতর থেকে ব্রার হাতল বের হয়ে গিয়েছিল। আমি দেখিয়ে দিলে বলে, তুমি তো আচ্ছা মানুষ দেখছি। বলার কী আছে। ঠিক করে দাও। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে বন্ধুদের সামনে ব্রার হাতল কামিজের ভেতর ঢুকিয়ে দিলাম। অথচ, আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম। কিন্তু ও একেবারেই নির্লজ্জহীন ছিল। হবেই তো। ও যে আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। তাই এটা দোষের কিছু নয়। লজ্জার পাওয়ারও কিছু নয়। খুব চাই আমি ওকে আদর করি। তাই ওর রসাল ঠোঁট দুটো নিয়ে সব সময় আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। ও জানে হাসলে ওকে দারুণ লাগে। তাই বাম গালের টোল পড়া গালে মিষ্টি হেসে আমাকে উতলা করে দেয়। হাসতে দেখলেই ক্ষেপানোর জন্য বলি, তুমি কি পান খাও দাঁতের ফাঁকে কালো দাগ? ক্ষেপে ভ্রু কুচকে বলে, কী উল্টাপাল্টা কথা বলছো, আমি টিউবওয়েলের পানি খাই। তাই মাঝে মাঝে এমন হয়ে যায়। রাগ তখন প্রিয়ার একেবারে আকাশে। রেগে গেলে আরো সুন্দর দেখায় তাকে। চেহারাটা লাল হয়ে যায়। একটা মেয়ে যে কত ভালোবেসে উজাড় করে দেয় তার প্রিয়জনকে তা মেয়েটির আদর না পেলে কেউ কখনো বুঝতে পারবে না। এটা পবিত্র ভালোবাসা থেকেই আপনা আপনি সৃষ্টি হয়ে যায়। আড্ডা শেষ করে প্রিয়াকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তার কথা ভাবতে ভাবতে রিকশাটা করে সবাই যখন বাসার সামনে এসে নামলাম, ঠিক তখনি দারোয়ান চাচা এসে বলল, তোমার মায়ের অবস্থা ভালা না। জলদি যাও।


প্রিয়া যখন আমার কাছে এসে বুক বরাবর দাঁড়ায়, নিঃশ্বাস ওঠানামা করে। ওর নিঃশ্বাসটাও আমি শুনতে পাই। মন চায় ওকে জাপটে ধরে আমার বুকের নরম লোমের মাঝখানে চেপে ধরি। সুযোগ পাই না, তা নয়। বরং আমি ওকে দূরে ঠেলে দিই। কাছে ঘেঁষতে দিই না। ও বুঝেও না বোঝার ভান করে। চেষ্টা আমাকে জয় করার। একদিন ওর কামিজের ভেতর থেকে ব্রার হাতল বের হয়ে গিয়েছিল। আমি দেখিয়ে দিলে বলে, তুমি তো আচ্ছা মানুষ দেখছি। বলার কী আছে। ঠিক করে দাও। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে বন্ধুদের সামনে ব্রার হাতল কামিজের ভেতর ঢুকিয়ে দিলাম


কি হয়েছে চাচা?
তুমি মিয়া সারাদিন তো ঘরেই থাহ না। তার অবস্থা বুঝবা কেমনে?
কথাটা শুনে খুব কষ্ট লাগল। ঠিকমতো যত্ন নেওয়া হয়নি কোনোদিন মায়ের। বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। এত বছর নিজের অক্ষমতার কারণে ঘৃণা করে এসেছিলাম মাকে। জানতাম এখানে কারো দোষ ছিল না। তবুও আমি মানতে চাইতাম না। বিধাতাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই রাগ সব মায়ের ওপর ঝাড়তাম। আরিফ দুরু দুরু মন নিয়ে মায়ের কাছে এসে বলল, কী হয়েছে মা?
মা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, কি বললি বাবা? আবার বল। তোর মুখে এই মা ডাক শোনার জন্য কত বছর অপেক্ষায় ছিলাম। কত রাত নীরবে জল ফেলেছি।
আমার কোনো দোষ নাই বাবা। কোনো দোষ নাই। তবুও মাফ করে দিস। তোর কাছে অনেক দোষী আমরা।
এসব কি বলছ মা? হ্যাঁ রে, আমাদের কোথাও নিশ্চয় ভুল ছিল। নয়লে তুই শাস্তি ভোগ করবি কেন?
এখন আমি শান্তিতে মরতে পারব বাবা। তোর মা ডাকটাই সবচেয়ে বড় পাওনা ছিল, তোর বুঝ হওয়ার পর থেকে এই ডাক আর শুনিনি। আর কিছু চাই না। তোকে আর একটি কথা বলব বলব করে বলা হয়নি বাবা।
কী কথা? তুই ওর ওপর রাগ করিস না। খুব ভালো সে। আরিফ একটু বিস্মিত হলো।
একটা মেয়ে প্রায়ই আসে। এসে আমার সেবা-যত্ন করে আবার চলে যায়। পরিচয় জানতে চাইলে এড়িয়ে যায়। শুধু বলে, ধরে নেন আপনার একটা মেয়ে। কিন্তু যাকে আপনি জন্ম দেননি। আপনার সেবা করায় আমার ভাগ্য। কথাটি বলেই মাও চুপ। আমিও চুপ। মা আমার চুপের আড়ালে কখন যে একেবারে চুপ হয়ে গেল টেরই পেলাম না। মায়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটাও আর পেলাম না। আমার মতো অপদার্থকে রেখে হুট করে মুক্তি দিয়ে মা আমার জীবন থেকে চিরতরে এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে যাবে, মাথায় আনিনি কোনোদিন। আমার জন্মটা আসলেই বৃথা। কাউকেই সুখ দিতে পারব না। নিজের এই অলুক্ষণে জীবনের সঙ্গে যেই থাকবে তার কপালও পুড়বে। ছাই হয়ে যাবে।
কিন্তু কে সেই মেয়ে? সন্তানের ভালোবাসা দিয়ে, মায়ের এত ভালোবাসা অর্জন করে মাকে তৃপ্ত রেখেছিল। কে সে?
ভাবনার মাঝখানে দারোয়ান চাচা এসে বলল, সব ব্যবস্থা কইরা দিছি, যাও খাটিয়া কান্দে লইয়া আজইর হও। যদি জানত বাবা-মা তোমার মতো সন্তান জনম দিব আমার মনে অয় তহনি হেরা গলা টিপ্পা মাইরা ফেলাইত।
অন্য সময় দারোয়ান চাচা এমন কথা বললে ঠিকই চটে যেতাম। বিরক্ত হতাম। কিন্তু আজ তার প্রতিটি কথা আমার মোটেও গায়ে লাগছে না। তার প্রতিটি কথা আমি শোনার যোগ্য মনে হলো।
মায়ের মৃত্যুর অনেক দিন পর আরিফ ভার্সিটি গেল। ক্লাসে ডুকতেই প্রিয়া হাত ধরে টান দিল।
তোমার কি হয়েছে? এতদিন ধরে খবর নাই?
মায়ের কারণেই, আমি কথা শেষ না করতেই প্রিয়া বলল, ও বুঝতে পেরেছি। মন খারাপ করো না। সবাই একদিন এই পরিস্থিতে পড়বে।
অবাক হলাম মায়ের কথা বলতেই প্রিয়া এমন ভাব দেখাল যেন সে সবই জানে। একটু বিরক্ত হয়ে আরিফ প্রিয়ার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, হাত ছাড়ো প্রিয়া।
কেন? হাত ছাড়ব কেন?
আমাকে মুক্তি দাও। নিজেও মুক্তি নাও। আমি একটা অকেজো মানুষ। আমার স্বপ্ন দেখার কোনো অধিকার নেই। তুমি শুধু ধ্বংস হবে। আমি তোমার ভালোবাসার লোভে এতদিন কিছুই বলিনি। সাহস পাইনি। আর না, আমি খুবই ক্লান্ত। আর সইতে পারছি না। আজই সব তোমাকে জানাতে হবে।
কি জানাতে হবে।
দয়া করে আজ ইয়ার্কি করো না। মন দিয়ে আমার জীবনের করুণ গল্প শোনো।
প্রিয়া হাসতে হাসতে বলল, কী বলবে তুমি? আমি সব জানি আরিফ।
তুমি কিছুই জানো না প্রিয়া। আমি তোমাকে স্বামীর সুখ দিতে পারব না।
তাতে কী হয়েছে?
আশ্চর্য কি হয়েছে মানে?
আরে বোকা আমি তোমার শরীরের অক্ষমতার কথা জেনেই তোমাকে ভালোবেসেছি ।
ভ্রু কুচকে আরিফ বলে, কি জানো তুমি? কীভাবে জানো?
শোনো বলি, শুরুতে ক্লাসে সবসময় দেখতাম তুমি অন্য মনস্ক হয়ে থাকতে। যে কেউ তোমার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলে তুমি এড়িয়ে যেতে। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলে রেগে স্থানটা ত্যাগ করতে। অন্যদের চাইতে তোমাকে একটু আলাদা মনে হতো। তাই আমি তোমাকে এত সহজে ছাড়ার মেয়ে ছিলাম না। কবে যে ভালোবাসার কলি একটু একটু ফুটে গেছে তোমার জন্য বুঝতেই পারলাম না। তাই তোমার বিরক্তির কারণ খুঁজতে লেগে গেলাম। একসময় তোমার পিছু নিলাম ঘর পর্যন্ত। খালাম্মার কাছে বিস্তারিত সব জানতে পারলাম। জেনে তোমার প্রতি আরো দুর্বল হয়ে পড়লাম। ব্যস, তোমাকে আর কে ছাড়ে!
তার মানে তুমি কি সেই মেয়ে? যার কথা মৃত্যুর আগে মা বলে গিয়েছিল। তুমি কি সেই?
হ্যাঁ আরিফ, আমিই সেই মেয়ে। ক্ষমা করে দিও পারলে। ভালোবাসার দিকটা ভেবে হলেও ক্ষমা করে দিও।

লেখক : গল্পকার ও শিশুসাহিত্যিক
tultul.sm@gmail.com

পিডিএসও/হেলাল