সাহিত্য সাধনার ধন

প্রকাশ : ০১ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০১ জুন ২০১৮, ১৫:২৮

সৈয়দ শিশির

‘সাহিত্য’ শব্দটি বাংলা ‘সহিত’ শব্দ থেকে সৃষ্ট। ইংরেজি ‘লিটারেচার’ (Literature)-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ‘সাহিত্য’ শব্দটি আমরা ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু লিটারেচার বলতে ব্যাপক অর্থে যাবতীয় লিখিত ও মুদ্রিত গ্রন্থ বা রচনাকে বোঝায়। এমনকি রেলগাইড, রান্নার বই, পঞ্জিকা, আইনগ্রন্থ কিংবা বলবর্ধক টনিকের গুণাগুণসম্বলিত নির্দেশিকাকেও বোঝায়। কিন্তু ‘সাহিত্য’ প্রকৃত অর্থে উল্লেখিত বিষয়গুলোর মতো নয়। জগৎ ও জীবনের বিচিত্র ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে মনের যে নিবিড় অনুভূতি রস সমৃদ্ধ হয়ে বাণীরূপ লাভ করে, তা-ই সাহিত্য। সাহিত্যে মানুষের আনন্দ-বেদনার বিচিত্র অনুভূতির শিল্পময় প্রকাশ ঘটে বলেই সাহিত্যকে বলা হয় মানব ও সমাজজীবনের দর্পণ বা প্রতিচ্ছবি।

‘সাহিত্য’ বলতে আমরা সেসব রচনাকেই স্বীকৃতি দিই, যেগুলো জীবন প্রবাহের বিচিত্র ও জটিল অভিজ্ঞতাসমূহকে মন্থন করে কোনো ‘বিশেষ সৃজন’ রূপে সৃষ্ট। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, সাহিত্য সাধনার ধন। কারণ, সাধনা করেই জীবন প্রবাহের বিচিত্র ও জটিল অভিজ্ঞতাসমূহকে মন্থন করে কোনো ‘বিশেষ সৃজন’ রূপে সৃষ্ট করা সম্ভব, অন্য কোনো উপায়ে নয়। মার্কিন কবি আর্চিবল্ড ম্যাকলিশের কথায়, ‘প্রকৃত সাহিত্যের জন্ম তখনই, যখন ভাষার সৌন্দর্য ও আবেগের ক্রিয়াশীলতা শব্দের আশ্রয়ে রূপ লাভ করে।’ সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘অন্তরের জিনিসকে বাহিরের, ভাবের জিনিসকে ভাষার, নিজের জিনিসকে বিশ্বমানবের ও ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলাই সাহিত্যের কাজ।’

সাহিত্যের দর্পণে প্রতিবিম্বিত হয় একটি জাতির জীবনপ্রণালি। প্রতিফলিত হয় কোনো দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি। মানুষের আবেগ ও মননের মাধ্যমে জীবনের সত্য, জীবনাতীতের সত্য ভাষার সৌন্দর্যে মণ্ডিত হয়ে সাহিত্যে উদ্ভাসিত হয়। সত্য যখন শব্দ শিল্পের পরশে সুন্দর হয়ে প্রকাশিত হয় তখন তা যুগ যুগ ধরে সংবেদনশীল হয়ে মানুষের মনে রসাবেদন সৃষ্টি করে। আর মানবমনে এ ধরনের পবিত্র আনন্দ সৃষ্টি করাটাই সাহিত্যের প্রধান কাজ। তাই সাহিত্যকে অবশ্যই শিল্পসুষমামণ্ডিত এবং রসোত্তীর্ণ হতে হবে। অলঙ্কারের রূপসজ্জায় সুসজ্জিত এবং রুচিবোধ ও নৈতিকতাবোধে উত্তীর্ণ হতে হবে। যে শিল্প-সাহিত্যে নীতি-নৈতিকতাকে অস্বীকার করা হয়, সেটা মূলত মানবতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছাড়া আর কিছু নয়। আবার এ কথাও সত্য, প্রকৃত সাহিত্য বিদ্রোহ করে নীতিকথার সমর্থনে, সে বিদ্রোহ করে জীবনের জন্য ন্যায্যতায় ও আকাঙ্ক্ষায়। প্রকৃত সাহিত্য কখনো জীবনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে না। জীবনকে নিয়েই তার বসতি, জীবনকে নিয়েই তার চলার পাথেয় সংগ্রহ করে অনিবার্য দ্রোহ ও প্রাজ্ঞতায়। এ ক্ষেত্রে বলতে হয়, যে সাহিত্য জীবনের কথা, দ্রোহের কথা, অনিবার্যতার কথা, প্রতিবাদের কথা বলে না, সে সাহিত্য কখনোই প্রকৃত সাহিত্যের মর্যাদা পায় না।


যেকোনো জাতির শিল্প-সাহিত্য যদি তাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি হয় তাহলে তুলনামূলক সাহিত্য হচ্ছে বিশ্বের জাতিগোষ্ঠীর মন-মানস, জীবনাচরণ, চিন্তা-দর্শন ও তাদের জীবনযাপন পদ্ধতির নিখুঁত দর্পণ। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে বাংলাদেশেও তুলনামূলক সাহিত্য অধ্যয়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে


রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যকে জ্ঞানের বিষয় না বলে ভাবের বিষয় বললেও আমাদের সমাজতাত্ত্বিকরা কিন্তু বলেছেন, সাহিত্য জীবনের প্রয়োজন থেকে উৎসারিত হয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তারা আরো বলেছেন, ‘জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো কিছুই সুন্দর নয়। জীবনের প্রয়োজনের বাইরে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।’ নন্দিত গদ্য লেখক প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘একথা সত্য যে, মানবজীবনের সঙ্গে যার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ নেই, তা সাহিত্য নয়, তা শুধু বাকছল। জীবন অবলম্বন করেই সাহিত্য জন্ম ও পুষ্টি লাভ করে।’ (ভূমিকা-প্রবন্ধ সংগ্রহ)। সুসাহিত্যিক মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘ভাত না খেলে তীব্র দুঃখ অনুভূত হয়, কিন্তু খেলে গভীর আনন্দ পাওয়া যায় না। একটা সুন্দর সনেট না পড়লে দুঃখ নেই, কিন্তু পড়লে খুশিতে মন ভরে ওঠে। দৈনিক পত্রিকা না পড়লে দিনটা মাটি হলো বলে মনে হয়, কিন্তু পড়লে তেমন তৃপ্তি পাওয়া যায় না। একটা ভালো সাহিত্যের বই না পড়লেও চলে, কিন্তু পড়লে মন আনন্দে নেচে ওঠে—জীবনকে সার্থক বলে অভিনন্দিত করতে ইচ্ছে হয়।’ (সংস্কৃতি-কথা-মূল্যবোধ ও যুক্তিবিচার, পৃষ্ঠা ৫৪, বাংলা একাডেমি দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৭০)। এবার বলতে হয়, মোতাহের হোসেন চৌধুরী যা বলেছেন তা-ই সাহিত্য। কেননা, মানুষের শুধু পেট ভরলেই চলে না, মনও ভরতে হয়। যদিও পশুর ক্ষেত্রে সে কথা খাটে না, তার পেটই আসল। আর মানুষমাত্রই মননশীল। মানুষের জীবনে সুন্দরের ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাহিত্যের জন্য জগতের কোনো স্থান নির্দিষ্ট নয়। তবে সাহিত্য যখন, যেখানে, যেভাবেই জন্মলাভ করুক না কেন—অবয়বে থাকে তার জন্মস্থান, যুগ এবং পারিপার্শ্বিকতার ছোঁয়া। তাই সাহিত্যের গবেষণায় দেখতে পাই, সাহিত্যের অনেকটা অবয়বজুড়ে আছে নদী, নারী, প্রকৃতি, রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম, যুদ্ধ এবং মুক্তিকামী জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধ।

কোনো সাহিত্য যখন, যেখানে, যেভাবে যার মাধ্যমেই সৃষ্ট হোক না কেন—সাহিত্যের সমালোচনাও আছে। কারণ, সাহিত্যের সমালোচক না থাকলে সৃষ্ট কর্মটি সকল সহজ সরল পাঠকের কাছে বোধগম্য করে তোলার কাজটি করবে কে? আর তা করতে না পারলে যে পাঠক বাড়ে না। তবে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—সাহিত্যের সমালোচনা করা যে কারো পক্ষে সম্ভব নয়। বরং সাহিত্যের সব ক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন এমন কোনো ব্যক্তির পক্ষেই সঠিকভাবে কোনো সাহিত্যের আলোচনা এবং সমালোচনা করা সম্ভব। তাছাড়া অদক্ষ শ্রমিক দ্বারা সাহিত্যের আগাছা সাফ করাতে গিয়ে যে মূল গাছকেই তুচ্ছ মনে করে কেটে ফেলার আশঙ্কা থেকে যায়! বলতে চাচ্ছি, এমন কিছু হলে অনেক প্রতিভা বিকশিত হওয়ার আগে আঁতুর ঘরেই যে শেষ হয়ে যাবে। আর তাতে সাহিত্যের বিরাট ক্ষতি হবে। মনে রাখা চাই, একজন বিজ্ঞ এবং মানবিক সমালোচক কেবল সামাজিক সম্পর্কের কারণে কোনো একজন সাহিত্যিককে বাহবা জানিয়ে যেমন মেকি সার্থকতার আসনে বসাবেন না, তেমনি সংকীর্ণ গণ্ডির প্রাধান্যে সৃষ্টিশীল প্রতিভাকে নেতিবাচক দৃষ্টি দিয়ে হত্যা করবেন না। তিনি কোনো সৃষ্ট সাহিত্যের সমালোচনা করার সময় নিজেকে কোনো স্কুলশিক্ষক ভাববেন না, কিংবা তিনি নির্দিষ্ট সাহিত্যিককে শাস্তি দেবার অধিকার রাখেন—এমন ধারণা পোষণ করবেন না। একইসঙ্গে এ কথাও বলছি, যারা সাহিত্য সৃষ্টি করবেন, তাদেরকেও অবশ্যই দায়িত্ব নিয়েই সৃষ্টি করতে হবে। লিখব আর মামার পত্রিকায় ছাপা হবে—এমন ভাবনা নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টির নামে মনগড়া কিছু করা উচিত নয়।

সাহিত্যকর্ম সৃষ্টির পর স্বীকৃত মানের কোনো সাহিত্যকর্মের সঙ্গে এর তুলনা করা যেতে পারে। এতে করে নিজের সৃষ্টিতে লুকিয়ে থাকা ভুল অথবা দুর্বলতা চিহ্নিত করা যায়। আবার এ ধরনের তুলনা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও হতে পারে। কারণ, আধুনিক সাহিত্যাঙ্গনের অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ তুলনামূলক সাহিত্য। এতে করে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাহিত্যের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে অন্য সাহিত্য দ্বারা কতটুকু প্রভাবিত হয়েছে এবং নিজেদের জাতীয় সাহিত্য পৃথিবীর অন্যান্য জাতির সাহিত্যের উন্নয়নে কতটুকু অবদান রেখেছে সে ব্যাপারে অবগত হওয়া যায়। তাই নিজেদের সাহিত্যের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য এবং বিশ্বসাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার থেকে নিজেদের রসবোধকে তৃপ্ত করার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই তুলনামূলক সাহিত্য অধ্যয়ন করতে হবে। কারণ, যেকোনো জাতির শিল্প-সাহিত্য যদি তাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি হয় তাহলে তুলনামূলক সাহিত্য হচ্ছে বিশ্বের জাতিগোষ্ঠীর মন-মানস, জীবনাচরণ, চিন্তা-দর্শন ও তাদের জীবনযাপন পদ্ধতির নিখুঁত দর্পণ। আর এ কারণেই বর্তমান যুগে গোটা ইউরোপ, আমেরিকা ও আরববিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য অধ্যয়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে বাংলাদেশেও তুলনামূলক সাহিত্য অধ্যয়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে।

আলোচনার শেষভাগে বলতেই হচ্ছে, যারা সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী তাদের জন্য সুন্দর একটি প্ল্যাটর্ফম থাকা চাই। যেখানে প্রতিযোগিতা থাকবে, বৈষম্য থাকবে না। তবেই সৃষ্টি হবে নতুন নতুন কালজয়ী সাহিত্যকর্ম।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
poetpoem.shishir@gmail.com

পিডিএসও/হেলাল