দ্রোহের কবির ১১৯তম জন্মজয়ন্তী আজ

প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৫ মে ২০১৮, ০৯:২৫

মনসুর হেলাল

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আজ শুক্রবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ, বাংলা সাহিত্যের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের ১১৯তম জন্মজয়ন্তী। দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা, শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। মূলত তিনি বিদ্রোহী। কবির প্রেমিক রূপটিও প্রবাদপ্রতিম। জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে প্রিয় কবিকে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাণীতে তারা কবির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

১৩০৬ বঙ্গাব্দের (১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দ) আজকের এই দিনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম। তার বাবা কাজী ফকির আহমেদ, মা জাহেদা খাতুন। দরিদ্র পরিবারে জন্মের পর অভাব-অনটনের মধ্য দিয়েই তিনি বেড়ে উঠেছেন। তার ডাক নাম ছিল দুখু মিয়া। বাবার অকালমৃত্যুর পর পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য কিশোর বয়সে তাকে নানা কাজ করতে হয়েছে। যেমন : মক্তবে শিক্ষকতা, মাজারে খাদেমগিরি ও মসজিদে মুয়াজ্জিন। এর পরও দুখু মিয়ার দুঃখ ঘোচেনি। তার পরও নজরুল বাঙালির চিন্তাচেতনার সীমাবদ্ধতা ও নিশ্চয়তার মধ্যে প্রায় এককভাবে জাগৃতিক বেগ ও ব্যাপকতা এনেছিলেন। গোটা বাঙালি জাতিকে তিনি জাগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন চেতনার প্রোজ্জ্বল শিখায়।

নজরুল ভারতবর্ষের মুক্তির জন্য সোচ্চার ছিলেন। এমনকি মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্বের বিরুদ্ধে, ধর্মের দোহাই দিয়ে অধর্মের চর্চার বিরুদ্ধে তিনি সর্বদা ছিলেন প্রতিবাদমুখর। তিনি নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে সচেষ্ট ছিলেন। আর এজন্যই তিনি জীবনভর সংগ্রাম করেছেন। মানবতার কল্যাণে সব মানুষের মিলিত শক্তিই প্রত্যাশা করেছেন তিনি। কবি লিখেছেন, ‘আমি স্রষ্টাকে দেখিনি, কিন্তু মানুষকে দেখেছি। এই ধূলিমাখা পাপলিপ্ত অসহায় দুঃখী মানুষই একদিন বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করবে।’

আর্থিক সমস্যায় নজরুল পড়াশোনা করতে পারেননি। কবিদলে কাজ করেছেন, রেলওয়ে গার্ডের খানসামাগিরি করেছেন, চা-রুটির দোকানে রুটি বানিয়েছেন—এভাবে বেশ কষ্টের মাঝেই তার বাল্য ও কৈশোর কেটেছে। তরুণ বয়সে তিনি মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষা না দিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। আড়াই বছর কেটেছে তার সেনাজীবন। এই সৈনিক জীবনেই করাচিতে তার সাহিত্যে হাতেখড়ি। প্রথম গদ্য রচনা বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী, প্রথম প্রকাশিত কবিতা মুক্তিসহ গল্প হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে, কবিতা সমাধি ইত্যাদি রচনা করেন।

১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, সৈনিক জীবন ত্যাগ করে তরুণ নজরুল গেলেন কলকাতায়। মনোনিবেশ করলেন সাহিত্যচর্চায়। দুই দশকের বেশি সাহিত্যজীবনে নজরুল বহু লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। সামাজিক অন্যায় ও বৈষম্য, হিন্দু-মুসলমানের সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামি, সামন্ত ও পশ্চাৎপদ সমাজ, শিক্ষিত সম্প্রদায়ের কূপমন্ডুকতা ও উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছেন তিনি। নিজের যাপিত সময়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রিক যন্ত্রণাকে সৃষ্টিকর্মের মধ্যে অঙ্গীভূত করে, নজরুল হয়ে উঠেছিলেন একটি স্বাধীন দেশ জাতি ও জীবনের রূপকার।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসুস্থ কবিকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধু কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেন। পরে তাকে জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিসিক্ত করেন।। বাংলা ১৩৮৩ সনের ১২ ভাদ্র (১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট) কাজী নজরুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় কবিকে।

জাতীয় পর্যায়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় একযোগে আজ কবির স্মৃতিধন্য ত্রিশাল, ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আগামীকাল কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালে বিকেল সাড়ে তিনটায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কবির জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন।

নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষে নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি এ উপলক্ষে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লার দৌলতপুর ও চট্টগ্রামে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় তার জয়ন্তী উদযাপন করা হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। চ্যানেল আই বরাবরের মতো আয়োজন করেছে নজরুল মেলার।