অবলম্বন

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৮, ১২:৫৭ | আপডেট : ১৮ মে ২০১৮, ১৩:৫৩

হাসান তানভীর

খলিল মণ্ডলের বাড়ি থেকে কাঁচাবাজারের দূরত্ব এক মাইলের কম নয়। বাজারের নাম খালেকবাজার। সপ্তায় দুইদিন হাট বসে এখানে। খলিল মণ্ডলের বাজার-সদাই হাটবারেই করার অভ্যাস। এক হাটে সদাই করলে পরের হাট পর্যন্ত অনায়াসে চলে যায় তার। চারটি মাত্র প্রাণী থাকে বাড়িতে। বৃদ্ধা মা, বউ, মেয়ে আর তিনি। একমাত্র ছেলে ঢাকার একটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে এ বছর। বিশ্ববিদ্যালয় কী, বোঝেন না খলিল মণ্ডল। বলেন কলেজ। ছেলে ইন্টারে ভালো পাস দিয়ে ঢাকায় বড় কলেজে ভর্তি হয়েছে—এটাই বোঝেন তিনি। স্কুলে থাকতে ছেলে সায়েন্স নিয়ে পড়ত। সায়েন্স যে ভালো পড়া, এটা সবার কাছে শুনেছেন। এটা পড়লে নাকি ডাক্তার হওয়া যায়। ছেলে সায়েন্স নিয়ে পড়ে বলে তার অনেক গর্ব হতো। সবার কাছে ছেলের ব্রেনের কথা মাথা উঁচু করে বলতেন। কিন্তু তার এই গর্ব বেশিদিন থাকেনি টাকা নামক অক্সিজেনের অভাবে।

সায়েন্স নিয়ে পড়লে অনেক খরচ। প্রতিমাসে প্রাইভেট বাবদ অনেক টাকা ব্যয় করতে হয়। স্কুলের দুই বছর অনেক কষ্ট করে ছেলের প্রাইভেটের টাকা জোগাড় করেছেন। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে গিয়ে আর দিতে পারেননি। তাই ছেলে জিপিএ-৫ পেয়ে মাধ্যমিক পাস করলেও উচ্চমাধ্যমিকে মানবিকে ভর্তি হতে বাধ্য হয়। এতে ছেলের যে কষ্ট হয়েছে, তার চেয়ে কোনো অংশে কম কষ্ট হয়নি তার। ছেলের কষ্ট বোঝার জন্য তিনি আছেন, তার কষ্ট বোঝার কেউ নেই।

বাজার থেকে এসে রাজিয়ার কাছে গামছা চাইলেন খলিল মণ্ডল। ওজু করে মসজিদে যাবেন। বাবা মা তাকে পড়ালেখা শেখাতে পারেননি। কয়েকটা সূরা-কালাম মুখস্থ করেছেন শুনে শুনে। তা দিয়েই কোনো মতে নামাজটা চালিয়ে নেন। শুদ্ধ হয় কি হয় না, জানেন না খলিল মণ্ডল। এই নামাজ দিয়ে পরকালে তার মুক্তি মিলবে কি না, কে জানে।

রাজিয়া হাতে গামছা নিয়ে এসে বলেন—‘বাজারের অবস্থা কেমন দেখলা রাকিবির বাপ? দাম কি আগের নাগালই আছে, না বাড়ল কিছু?’

‘দাম আর কোহনে বাড়ল রাকিবির মা। আগের নাগালই। ব্যাপারিরা কয় দাম নাকি বাড়বার পারে। তয় সুমায় লাগবি।’

‘খ্যাতে তো ধান নষ্ট অয়া যাবি আর কয়দিন থাকলি। কাইল পশশুর মধ্যি কিশশেন নিয়া হালাও। দাম না বাড়লি গুলায় উঠায় থুবানি।’

‘হ তাই করা লাগবি।’

কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে ওজু করা হয়ে গেছে খলিল মণ্ডলের। গামছা দিয়ে হাতমুখ মুছে মসজিদের দিকে রওনা দিলেন।

খলিল মণ্ডল একজন প্রান্তিক কৃষক। নিজের জমি বলতে ভিটেটা আর তার পাশেই একটুকরো পতিত জমি। ওখানে কিছু সবজি চাষ করেন। তার চাষবাস সব অন্যের জমিতে। বিঘেখানেক বছর চুক্তিতে লিজ নেওয়া আর কিছু আছে বন্ধকের। ধানিজমি এগুলো। তাদের চকে ধান ছাড়া কিছু হয় না। দক্ষিণের চকগুলোতে দারুণ পেঁয়াজ হয়। তাই ওদিকের কৃষক পরিবারগুলো ইদানীং স্বচ্ছল হয়ে উঠছে।

আজ মাসের ৯ তারিখ। গত মাসের মেস ভাড়া বাকি পড়ে আছে। মাসের ১০ তারিখের মধ্যে মেসভাড়া দেওয়ার নিয়ম। লিটন ভাই সকালে একবার মনে করিয়ে দিয়ে গেছেন। কালকের মধ্যে একসঙ্গে দুই মাসের ভাড়া দিতে হবে তার। বাবার কাছে টাকা চেয়েছে রাকিব। বাবা বলেছেন, দু-এক দিনের মধ্যেই ধান বিক্রি করে টাকা পাঠিয়ে দেবেন।

রাকিব প্রথমবর্ষের ছাত্র। কলেজে থাকতে সে শুনেছে, অনার্সে পড়াকালীন টিউশনি করে নিজের খরচ নিজে চালানো যায়। কিন্তু অনার্সে ভর্তি হওয়ার চার মাস পার হয়ে গেলেও সে এখনো টিউশনি পায়নি। মানবিকের ছাত্রদের টিউশনিতে চাহিদা এমনিতেই কম। তারপর আবার সে জুনিয়র। গ্রাম থেকে উঠে আসা। শহরের হাবভাব এখনো ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেনি। তাই থাকা-খাওয়া বাবদ পাঁচ হাজার টাকা বাড়ি থেকেই নিতে হয়।


গত মাসের মেস ভাড়া বাকি পড়ে আছে। মাসের ১০ তারিখের মধ্যে মেসভাড়া দেওয়ার নিয়ম। লিটন ভাই সকালে একবার মনে করিয়ে দিয়ে গেছেন। কালকের মধ্যে একসঙ্গে দুই মাসের ভাড়া দিতে হবে


সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে আড্ডা দেয় রাকিব। সবাই চা-বিস্কুট খায়। রাকিবের কিছু খেতে ইচ্ছা করে না। তার মনে হয় এখানে চা-বিস্কুট না খেলে তার একটা মিলের টাকা বেঁচে যাবে। বন্ধুরা হই হুল্লোড় করে আর সে গুটিয়ে থাকে নিজের মধ্যে। শহরের যান্ত্রিক জীবন, ল্যাম্পোস্টের নিয়ন আলো তার কাছে বড় অদ্ভুত লাগে। মানুষের সমুদ্রে দাঁড়িয়েও মনে হয় সে বড্ড একা। অনন্ত নক্ষত্রবীথির মধ্যে একাকী ঘুরে বেড়ানো এক বামন গ্রহ। তার সুনির্দিষ্ট কোনো গতি নেই। হাত-পা অবস হয়ে আসে। অবচেতন মন ভুলিয়ে দেয় সময়ের পরিমাপ।

খলিল মণ্ডল আজ ধান কেটেছেন। আগে ধান মাড়াইয়ের জন্য ব্যাপক কর্মযজ্ঞের প্রয়োজন হতো। এখন বেশি কষ্ট নেই। মেশিন দিয়ে খুব সহজেই ধান মাড়াই করা যায়। ছেলে টাকা চেয়েছে। আজকের মধ্যেই ধানগুলো মাড়াইয়ের কাজ শেষ করতে হবে। আগামীকাল হাটবার। হাটে ধান বিক্রি করেই টাকা পাঠিয়ে দেবেন ছেলেকে।

কয়েক দিন ধরে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছেন খলিল। রাজিয়া তাকে বিশ্রাম করার কথা বলতে চেয়েও পারেননি। তার নিজেরও কম পরিশ্রম হচ্ছে না। কিন্তু তিনি নিজের জন্য চিন্তা করেন না। তার যত চিন্তা স্বামী-সংসার নিয়ে।

প্রতি হাটবারে খলিল মন্ডল চেষ্টা করেন একটা ভালো মাছ কিনতে। সপ্তাহের অন্য দিনগুলো নিরামিষ গেলেও দুটো দিন অন্তত ভালো খেতে চান। আজ মেয়েটা ইলিশ মাছ নিতে বলেছে। শেষ কবে ইলিশ মাছ কিনেছেন, মনে নেই খলিলের। কিন্তু আজ তিনি ধান বিক্রি করবেন। হাতে কিছু টাকা আসবে। ইলিশ মাছ কিনতে কষ্ট হবে না নিশ্চয়ই।

হাটে ভীষণ ভিড়। বাজারে নতুন ধান আসায় অন্য দিনের তুলনায় আজ লোক সমাগম বেশি। ধান হাটায় যেতে হয় মাছ হাটার পাশ দিয়ে। যাওয়ার সময় মাছের দোকানগুলোর দিকে একটা নজর বুলিয়ে গেলেন খলিল। প্রচুর ইলিশ মাছ উঠেছে আজ।

ধান হাটায় গিয়ে খলিল মণ্ডল খেয়াল করলেন, চাষিদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ। যারা ধান এনেছে বিক্রি করার জন্য, তাদের অনেকেই ফিরে যেতে চাইছে বিক্রি না করেই। কী ঘটছে, কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না। খলিল দেখলেন তার গ্রামের সামাদ শেখও ধান নিয়ে এসেছেন। সামাদ তার বয়সে বড়। কাকা বলে ডাকেন। খলিল সামাদ শেখকে ডাক দিয়ে বললেন—‘কাকা খবর কী? সবাই ধান ফিরায় নিতে চাইতেছে ক্যা?’

‘বুঝো না? কেবল আইলানি? ধানের দাম কইমা গেছে।’ সামাদের চোখেমুখে বিরক্তির ভাব।

‘কমছে মানে? গত হাটে সবাই তো কইলো ইবার দাম বাড়বি!’ খলিলের কণ্ঠে বিস্ময়।

‘খোঁজখবর তো রাখো না মিয়া। সরকার বিদেশ থিকা চাইল আমদানি করছে। বাজারে চাইলের যে চাহিদা, তা পূরণ হয়া গেছে। এহন তোমাগো এই মোটা চাইল কিনবো ক্যাডা? ধান ফিরায় নিয়া যাও। দ্যাহো সামনের হাটে দাম বাড়ে কিনা।’

খলিল মণ্ডল হতবাক হয়ে যান সামাদ শেখের কথা শুনে। সামাদের কথা সত্য। ধানের দাম তো বাড়েইনি, উল্টো কিছুটা কমেছে। যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে তাতে ধান বিক্রি করলে খরচের টাকাই উঠবে না। তার তিন মাসের হাড়ভাঙা খাটুনি সব বৃথা যাবে! কিন্তু আজ যে তাকে ধান বিক্রি করতেই হবে। দুচোখে স্বপ্নভরা ছেলের মুখটা ভেসে উঠল খলিলের মনে। ছেলের স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেবেন না। তার হয়তো এক বেলা উপোস করতে হবে কিন্তু মনের মধ্যে শান্তি থাকবে, তার ছেলে তার মতো কৃষক হবে না। কষ্টে বুকটা খানখান হয়ে গেল খলিলের। বেঁচে থাকার সঞ্জীবনীটুকু বিক্রি করে ছেলের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

খলিল বাড়ি ফিরলেন একরকম চোরের মতো। মেয়েকে কী জবাব দেবেন তা ভেবে ঘেমে যাচ্ছেন তিনি। রাজিয়া চুলোয় ভাত চড়িয়ে দিয়েছেন। মেয়েটা পাশে বসে আছে। তার আগমন টের পেতেই দৌড়ে এলো খুশি। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানতে চাইলো—‘আব্বা ইলিশ মাছ আনছো?’

খলিলের মনে হলো, এই প্রশ্নটার মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে মাটিতে মিশে যাওয়া ভালো ছিল। কী উত্তর দেবেন, ভেবে পান না খলিল। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে ব্যস্ততার ভান করে বললেন—‘নারে মা, কয়দিন ধইরা নাকি জাইলারা ইলিশ মাছ পাইতেছে না। যা পায় তা বিদ্যাশে চইলা যায়। হাটে ইলিশ মাছ নাই। পরের হাটে আনবানি।’

মেয়ের কাছ থেকে বাঁচতে অবলীলায় মিথ্যে কথাটা বলে গেলেন খলিল। তিনি জানেন, তার এই মিথ্যায় দোষ নেই। এটা মিথ্যে নয়। এটা বেঁচে থাকার অবলম্বন। তাদের মতো হতভাগাদের জন্য ঈশ্বরের অনুমতি আছে মিথ্যে বলার।

পিডিএসও/হেলাল