কয়েকটি ফরাসি কবিতা

প্রকাশ : ১১ মে ২০১৮, ১২:০৬ | আপডেট : ১১ মে ২০১৮, ১৩:৫৮

অনুবাদ : মুম রহমান

একটি প্রাণবন্ত সরাইখানা
(ব্রাসেলস থেকে ওকেলে যাওয়ার পথে)
শার্ল বোদলেয়ার

আমি জানি হে সুরুচির কাঠামো
এবং লোক মিষ্টান্নের নিদর্শন
তোমার সরলতম রসনা পূরণে
(একটি ডিম ভাজাও বাকি স্বাদ সেরে নেবে)

আর তাই, প্রাচীন ফারাও, মনসেলে*
এইখানে এই পথে আমি তোমাকেই ভাবছি 
কেননা একটি অপ্রত্যাশিত সাইন এখানে ঝোলানো
বলা আছে : সরাইখানা, সমাধি মদ ও কফি দোকানের দিকে।

ফরাসি কবিতায় শার্ল বোদলেয়ার এক সাহসী সম্রাট। কবিতাকে দিয়েছেন নতুন চেহারা ও মাত্রা। তার লে ফুল দ্যু মাল (শয়তানের ফুল) ঊনিশ শতকের প্যারিসের শিল্প-কারখানার বদল যেমন তুলে ধরে, তেমনি নবতর নন্দন ভাবনাকেও চিত্রিত করে। বোদলেয়ারের শক্তিশালী এবং মৌল চিন্তাভাবনা পল ভেলেরি, আর্তুর র‌্যাঁবো, স্টিফেন মার্লার্মে তথা ফরাসি কবিতাকেই প্রভাবিত করেছে। আজকের আধুনিক কবিতার বিশ্বব্যাপী বিস্তারে তার ভূমিকা অনন্য। এমনকি সাহিত্যে আধুনিক শব্দটির (modernité) আনুষ্ঠানিক ব্যবহার এবং আধুনিকতার চর্চাও তার হাত ধরে সূচিত হয়েছে। কবিতার পাশাপাশি তিনি প্রবন্ধ ও শিল্প সমালোচনাও করেছেন এবং এডগার এলান পো’র বহু লেখা অনুবাদ করেছেন। 

*চার্লস মনসেলে ঊনবিংশ শতকের একজন উপন্যাসিক, নাট্যকার, কবি, সাংবাদিক। তাকে আদর করে ভোজন রসের রাজা বলা হতো। 

 

মানের আঁকা লোলা দ্যু ভ্যালেন্স 
শার্ল বোদলেয়ার

রস বোদ্ধাদের মাঝে দ্বিধার আধিপত্য
বুক পশ্চাদদেশ আর ঝলকানো দেহ,
তবু স্প্যানের লোলা তার দুষ্ট আঁচল উড়ায়—
কোন জহুরি দেখেছে তার মতো জহরত আগে?*

*ঊনিশ শতকের ইম্প্রেসন্টিস্ট যুগের প্রথম দিককার ফরাসি চিত্রকর এডওয়ার্ড মানে। স্প্যানিশ একটি ব্যালে দল প্যারিসে এলে মনে দ্রুত হাতে লোলা দ্যু ভ্যালেন্সের প্রতিকৃতিটি আঁকেন। ফ্রান্সিসকো গোইয়ার আঁকা ডাচেস অফ এলবা’র ভঙ্গিতে এই চিত্রটি তিনি আঁকেন। লোলা’র রঙিন পোশাক, ঝলমলে চুমকি, কারুকাজ এই ছবিকে জমকালো সৌন্দর্য দিয়েছে। বন্ধুর আঁকা এই ছবিটি বোদলেয়ারকে খুব টেনেছিল। এই চিত্রকলাটি নিয়ে বোদলেয়ারের চার লাইনের কবিতা। 

মুম রহমান কবি ও গল্পকার

তারারা কেঁদেছিল গোলাপি রঙের গানের বাণীতে
আর্তুর র‌্যাঁবো

তারকারা কেঁদেছিল গোলাপি কান্না তোমার কর্ণ মর্মমূলে
অসীম আবর্তিত হয়েছিল তোমার গ্রীবা থেকে কটিদেশ পর্যন্ত
সমুদ্র চূর্ণ করেছে পিঙ্গল আভা তোমার সিঁদুর রঙা স্তনবৃন্তে
আর পুরুষ ঝরায় কৃষ্ণ রক্ত তোমার অখণ্ড পাঁজরে। 

জ্যাঁ নিকোলাস আর্তুর র‌্যাঁবোকে (১৮৫৪-১৮৯১) বিশ্বকবিতার রাজপুত্র বলা হয়। মাত্র ৩৭ বছর বেঁচেছিলেন। লিখেছেন খুব কম। ২১ বছর বয়সেই অভিমান করে লেখালেখি ছেড়ে দেন। কিন্তু আধুনিক কবিতায় র‌্যাঁবো আজ অবিস্মরণীয় নাম। তার কবিতা আর্দ্রে ব্রেতা, ডিলান টমাস, মার্ক বোলান, জ্যাক ক্যারুয়াক, ভ্লাদিমির নবোকভ, বব ডিলান, হেনরি মিলার, জিম মরিসনের মতো ব্যক্তিদের কাজকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। প্রতীকবাদী কবি র‌্যাঁবো ব্যক্তিজীবনে ভীষণ রুক্ষ, মেজাজি ছিলেন। আরেক বিখ্যাত কবি পল ভেলরির সঙ্গে তার সম্পর্ক বিশ্বসাহিত্যে আলোচিত।

প্রস্থান
আর্তুর র‌্যাঁবো

সব দেখা হলো... দৃষ্টি প্রতিধ্বনিত হয় সকল বাতাসে। 
সব শোনা হলো... দূর নগরের শব্দ, বিকালে, সৌরালোকে এবং সদাই।
সব জানা হলো... আহা বেদনা! আহা দৃষ্টি! এই বুঝি জীবনের সমাপ্তি।

প্রস্থান করি প্রেম ও উজ্জ্বল শব্দের মাঝে। 

প্রতিদিনের সংবাদ সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রিন্ট সংস্করণ

নদী
পল এলুয়ার

নদীটি আছে আমার জিহ্বার নিচে
অভাবনীয় জল, আমার ছোট্ট নৌকা
আর পর্দা নেমে আসে, চলো, কথা বলি। 

স্যুরিয়ালিস্ট কাব্যধারার অন্যতম প্রবক্তা ফরাসি কবি পল এলুয়ার (১৮৯৫-১৯৫২)। দাদা মতবাদের সঙ্গে তার গভীর সংযোগ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ তার বিশ্ব-বীক্ষায় বদল এনেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিমান থেকে তার ‘লিবার্তে’ (স্বাধীনতা) কবিতাটি ইউরোপের নানা স্থানে ফেলা হয় নাৎসিবিরোধী প্রচারণার অংশ হিসেবে। 

 

পাঁচটি হাইকু
পল এলুয়ার

বাতাস
সিদ্ধান্তহীন
একটা সিগারেটের ধোঁয়াকে পাক খাওয়ায়।

বোবা মেয়েটি কথা বলে :
এটা শিল্পের অসম্পূর্ণতা।
এই অবোধ্য কথা। 

মোটর গাড়িটি যথার্থই চালু হয় :
চারজন শহিদের মাথা
চাকার নিচে পাক খায়। 

আহ! সহস্র শিখা, একটি আগুনের,
আলো আর ছায়া!
সূর্য আমাদের অনুসরণ করছে। 

টুপির ওপরে একটি পালক সংযোজন
একটি হাল্কা ছোঁয়া : 
চিমনি থেকে বের হচ্ছে ধোঁয়া।

 

​পিডিএসও/মীর হেলাল