স্বদেশপ্রেমের বিনম্র রৌদ্রছায়ায় এক কবি

প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৮, ১৪:৫৫ | আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৮, ১৫:২০

জোবায়ের মিলন
বেলাল চৌধুরী [১৯৩৮-২০১৮]

ব্যক্তি অন্বেষা নয়, কবিতার শরীর ওম খুঁজে নিত তার কাছে। উষ্ণতায় জাগত কালো অক্ষরে সাদা পাতার গাত্রে। তিনিও আদরে আশ্রয় দিতেন প্রতিটি বর্ণ, প্রতিটি শব্দের কলতানকে। ভাবতেন না তাতে কার ক্ষতি, কার লাভ? কবিতা পূর্ণতা পেত তাতেই পরিতৃপ্তি, তাতেই শান্তি। সে শান্তিকে ধরতেই কবিতাকে বুকের নিচে রেখে যাতনা পিঠে নিয়ে বেড়িয়েছেন—এ গঙ্গা থেকে ও গঙ্গা, ও গঙ্গা থেকে এ গঙ্গা। শাসকের ভয়ে পালিয়েছেন দেশ ছেড়ে, থাকেননি মাতৃমায়ার দূরে। সময়কাল বুঝে ফিরে এসে আবার থিতু হয়েছেন মায়ের কোলে, মায়ের বোলে। মায়ের জন্য হেসেছেন, কেঁদেছেন, অভিমান করেছেন নীরবে-নিভৃতে। সে অভিমান কেউ ধরতে পেরেছেন, কেউ পারেননি তাতে কবি বেলাল চৌধুরী থাকেননি শব্দের আড়ালে। চলে যাননি কবিতার রাষ্ট্র থেকে নির্বাসনে। শব্দের ভাষণে, বাক্যের নির্মাণে বলেছেন মনের অন্তপুরের অনন্ত কথাগুলো। বলতে চেয়েছেন মাতৃভূম আর মায়ের এদেশ থেকে তিনি কখনোই দূরে নন, দূরত্ব নেই তার এ মাটির সঙ্গে। বরং এ মাটিই যে তাকে ভাবায় তার প্রমাণ মেলে একান্তে লিখে চলা কবিতার বয়ানে—

‘আমি আছি ব্যপ্ত হয়ে তোমার রৌদ্রছায়ায়/এই তো তেমার ঘামে গন্ধে তোমার পাশাপাশি/তোমার ছায়ার মতো তোমার শরীর জুড়ে/তোমার নদীর কুলকুল স্রোতে;/ঝিরিঝিরি পাতার ভেতর হাওয়ার নাচে/রাত্রিদিন তোমার ধানের ক্ষেতে/উদাসী বাউল; ভাটিয়ালি গান ভেসে/যায় কোন নিরুদ্দেশে; আছি আমি/বেলা শেষের রোদের মতো/গড়িয়ে তোমার পায়ে পায়ে/আছি আমি তোমার ধানের দুধে/তোমার আঁচল ছোঁয়া নীলাম্বরী মেঘে/আছি আমি এই তো তোমার/নাকছাবিটির মুক্তো যেমন/জ্বলছে কেবল জ্বলছে কেবল’ (কবিতা : স্বদেশ)।

কে বলবে কবি নীরব, কবি কোথাও নেই! এই বাংলায়, এই ধানের ক্ষেতে, ঝিরিঝিরি পাতার ভেতর, হাওয়ার নাচে কবি যে নিজেকে পুঁতে দিয়েছেন অনশ্বর ভাবের ভালোবাসায়। আকাঙ্ক্ষায় কম নয়; ইচ্ছায় প্রেমে নিগূঢ় টান এদেশের প্রতি। এ বাংলার প্রতি। কবির ব্যপ্তি সারা বাংলায়, বাংলার রৌদ্রছায়ায়। এ ছায়ার মায়ায় কাতর কবি আনমনে গুণগুণ করে কবিতা না পড়ে আর কী করতে পারেন? যিনি বলতে পারেন—‘আমি আছি তোমার ধানের দুধে, তোমার আঁচল ছোঁয়া নীলাম্বরী মেঘে।’ তিনি তো আর দশজনের মতো নন। স্রোতে গা ভাসিয়ে চলা কোনো সাধারণ নাগরিক নন, ক্ষেতের আল দিয়ে হইহই করে চলে যাওয়া রাখাল নন। তিনি মাতৃভূম-প্রেমে নিবদ্ধ প্রেমিক। তিনি দেশ মাতৃকার প্রহরী, ভালোবাসায় উন্মাদ সফেদ মানুষ। স্বভাবে বাউণ্ডুলে মানে এই নয় সে উগ্র, এই নয় সে পাষাণ, এই নয় সে নির্বোধ। তার বোধের ভেতর খেলা করে অন্য কিছু। অনেক কিছুর সঙ্গে কবির চিন্তায় কল্পনায় ভাবনায় অনন্য এক বাংলাদেশ, অভিন্ন এক মায়াময় ছবি এদেশের। নিজের দেশের। তার ছবি বারবার এঁকেছেন তার কবিতার পঙতিতে নিবিড় এক রেখাটানে—

‘সারাদিন আমি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে কী দেখেছিলাম?/ভাটফুল, আনন্দের ঝোপঝাপ/মাছরাঙাদের অকারণ খিটিমিটি?/গ্রামীণ ছবিতে আজ আর নেই সেই কিংবদন্তিখ্যাত মসলিন, নকশি কাঁথার দিন!/গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ/এ জাতীয় কথারা আজ/সেরেফ কথার কথামালা/গ্রামগুলি হতশ্রী/এমনকি অগুণতি/অনেক মানুষ মিলিয়ে যে-মানুষ ছবি/চোখের সামনে জেগে ওঠে/তার মতো হতকুচ্ছিত প্রাণি যেন আর কিছুই হয় না’ (কবিতা : আত্মপ্রতিকৃতি)।

স্মৃতির সাগরে কতজন কত রাজার গল্প, কত রাজ্যের কল্প, কত হীরামাণিক্যের উজ্জ্বল চিত্র তুলে রাখেন। কত কত স্বপ্ন বুনে রাখেন। আর কবি বেলাল চৌধুরী; যার যৌবন নামের পাশে ‘বাউণ্ডুলে’ অঙ্কিত সোনার হরফে, সে কবির স্মৃতি ভরা গ্রামাঞ্চল! গ্রাম বলতে দেশ, এক টুকরো শৈশব, একটা বিলাস ভূখণ্ড। স্মৃতির সাগরে সাঁতার দিতে গিয়ে যে অঙ্কন চোখে ভাসে তার সঙ্গে এখন আর মিলে না বাস্তবতা। পট বদলে ধানের ক্ষেতে ইটের ভাটা, পুকুর জলে বহুতল, কই-খলশের পরিবর্তে বিদেশি মাগুর, মেঠো পথে পিচের ছোঁয়া, কাঠের নৌকা উঠে নেমেছে সড়ক পথে অটো-ইঞ্জিন। এসব হতেই পারে, কিন্তু হতে গিয়ে চিরচেনা বাংলার যে রূপ আউল-বাউলের স্বরে সে বাংলা আর মেলে না। মেলে না বলেই বেলাল চৌধুরীর কলমে অচেনা দুঃখ জাগে, অচিন ব্যথায় তিনি শালীন ছন্দে লেখেন উপর্যুক্ত কাব্যকথা। এ শুধু লেখার জন্য লেখা নয়, এ শুধু কাব্যের জন্য কাব্য নয়, এ তো একটি উপলব্ধি! এ তো একটি লালিত ভালোবাসার প্রকাশ, না পাওয়ার ব্যথা বা হারানোর কষ্ট। এ তো অনেক দিনের চেনাকে অচেনার যাতনা। গ্রামীণ বাংলা ধীরে ধীরে যান্ত্রিক হবার পেছনের বেদনা। মলিন গ্রামকে দেখে, গ্রামের আঁকেবাঁকে হেঁটে বেলাল চৌধুরী এ কবিতায়ই বলেছেন—‘হঠাৎ আমার মনে হয়, এই বিংশ শতাব্দীর একজন নিঃস্ব/নিঃসঙ্গ মানুষ আমি/ভান করি স্বেচ্ছা নির্বাসিতের/অনিকেত বলতে উদ্বাহু হয়ে উঠি/অথচ জন্মেছি এইসব অখ্যাত গ্রামে গঞ্জেই/পূর্ব পুরুষেরা ছিলেন কৃষিকর্মী/অধুনা আত্মপ্রতারণায় নগরনিবাসী আমি/আর কতকাল এমন করে নিজেকেই নিজের চোখে ঠাওরাবো?’

এই যে ব্যথা, এ ব্যথা কীসের ব্যথা? এ কি অর্থ-সম্পত্তি না পাওয়ার, ঘরবাড়ি না পাওয়ার, সুন্দরী রমণী না পাওয়ার, প্রাচ্য বা প্রাচুর্য না পাওয়ার? এ ব্যথা তো নিজের ভেতরে পুষে তিলে তিলে বড় করা এক দেশপ্রেমের ব্যথা। যে দেশের ছবি বুকের অলিন্দে সুইসুতো দিয়ে কাঁথার মতো হাজার বছরে গাথা সে ছবি মলিন বা অতি উজ্জ্বল হয়ে নিজের ভেতর থেকে ঠিকরে পড়ার ব্যথা। যেমন ভালোবাসি তেমন করে না পাওয়ার ব্যথা। কবি বেলাল চৌধুরীর এ ব্যথাক্রান্ত ক্রন্দন ক্ষীণ নয়, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ। তিনি হয়তো সমবণ্টনের খামার দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি হয়তো বৃক্ষে বৃক্ষে শোভিত সেই ছোট্ট বেলার গাঁও আজও দেখতে চেয়েছিলেন, রাখতে চেয়েছিনেল, এর মাঝে থাকতে চেয়েছিলেন। তাই তার কণ্ঠে এমন বিষাদ। বিষাদ ঠিক নয়, প্রেমযাতনা। বেলাল চৌধুরীর কবিতায় এমন বিলাপ অহরহ। এমন বিষণ্নতা বারবার এসেছে। তিনি লোক দেখানো পরিকল্পিত কবিতা লেখেননি। ছক কেটে কবিতার শরীর তৈরি করে সে কবিতায় দেশপ্রেম ঠেসে দিয়ে প্রেমিক সাজার চেষ্টা করেননি। করেনটি কবিতাকে পুঁজি করে প্রতারণা। অসত্যের মোড়কে আবৃত্ত হয়ে কোনো কথা বলতে চাননি কবিতায়, কাব্যের চেয়ে ভণিতাকে উচ্চে তুলে ভাড় হয়ে হাসাননিও কাউকে। যা তার বিশ্বাস, যা তার তাড়না তা-ই তিনি কবিতার গায়ে উল্লেখ করেছেন সানন্দে—

‘আমার গোপন পাপগুলি এতদিন পর/বিরূপ-বৈরিতায় শস্ত্রপাণি হয়ে উঠেছে/এবার তাদের বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে/উচ্চারিত হলো—আমার কঠোর দণ্ডাজ্ঞা/আমার মাথার ওপর উত্তোলিত তীক্ষ্ণ কৃপাণ/চোখের সামনে জ্বলন্ত লাল লৌহ শলাকা/ওদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এবার ওটা অটল/আমার সর্বাঙ্গ ছেঁকে ধরেছে মাছির মতো—বিস্ফোরক দগদগে ঘা, পুঁজ আর শটিত গরল/গোপন পাপের শরশয্যায় শুয়ে আমি/নিদারুণ তৃষ্ণায় ছটফট করছি—হায়রে জলধারা/কিন্তু এবার ওরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—নিষ্কৃতি নেই আমার/নির্বাসনে মৃত্যুদণ্ড—ঠাণ্ডা চোখে দেখছি আমি/নীল কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে আমার দেহ’ (কবিতা : প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি)।

আহ্! একটি জলধারা জন্য কেমন আকুতি। কেমন তার ছটফটানি। এই যে বলছেন, গোপন পাপ! এটা কীসের পাপ? স্বদেশের জন্য কিছু করতে না পারার পাপ? নিজের জন্মভূমির জন্য নিজের মতো করে বাগান তৈরি করতে না পারার পাপ? আর নির্বাসন! কোন নির্বাসনে কথা উঠছে? একজন মানুষ যখন সবকিছু ছেড়ে আপনার ভেতরে আশ্রয় নেন সেটাও তো একপ্রকার নির্বাসন! বেলাল চৌধুরী কি সেই নির্বাসনের কথা বলছেন ইঙ্গিতে? তা-ই যদি হয়, কবি তো নির্বাসিতই। নির্বাসিত না হলে সৃষ্টি যে আসে না স্রষ্টার কব্জিতে। কব্জিতে থেকে নামে না সাদা পৃষ্ঠায়। বেলাল চৌধুরী একটা সময়ের পরে নির্বাসিত জীবন বেছে নিয়েছেন নিজে নিজেই। অন্তরে ডুব দিয়ে তুলতে চেয়েছেন হীরকখণ্ড। দিতে চেয়েছেন দেশকে। দিতে চেয়েছেন তার সময়কে। যাদের দিতে চেয়েছেন তাদের প্রতিই হয়তো এ উক্তি—‘কিন্তু এবার ওরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—নিষ্কৃতি নেই আমার/নির্বাসনে মৃত্যুদণ্ড—ঠাণ্ডা চোখে দেখছি আমি/নীল কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে আমার দেহ।’ যারা অনেক দেন তারা কখনো নিজের প্রাপ্তির কথা ভাবেন না। ভাবতেও চান না। বরং আরো না দিতে পারাটাকে দুঃখ করে কাঁদেন। মনে করেন কিছুই হলো না দেওয়া। অথচ, তাদের ঋণ বহন করার শক্তি নেই আমাদের। বেলাল চৌধুরী স্বদেশের মায়ায় এমনি করে কেঁদেছেন সারাবেলা। সারা সময়। কেউ হয়তো বুঝেছি, কেউ হয়তো বুঝিনি। কবিতায় তার কান্না স্পষ্ট। তা বুঝি আর না-ই বুঝি।

‘জটিল অরণ্যে তুমিই একমাত্র বিটপী/শালের মতো অটল, সেগুনের মতো নমনীয় ও কোমল/ঝাউয়ের মতো তোমার মর্মরিত মাধুর্যের দিকে, কুঠারেও/তার কুড়ালের হাতলে আলতো রেখে দাঁড়ায় ফিরে।/বৃষ্টি তবু তুমি, তোমার উড়ন্ত উজ্জ্বল সবুজ চুল/দূরের বাতিঘরের মতোই করে প্রলোভিত... তুমি সেই বৃক্ষ, আমি কুঠার হয়ে দেখেছি/তোমার সমারোহের কাছে অবরুদ্ধ হয়ে/চিহ্নিত করি তোমাকে নিজেরই জন্য/সহিষ্ণ, ধূর্ত ও কুশলী হাতে/তোমার দেহকে অনাবৃত করে/নিয়ে যাই তোমার হৃদয় নিজেরই গূঢ় প্রয়োজনে’ (কবিতা : তুমি সেই বৃক্ষ)।

এটা কবির দুঃখ। কবি এসবের জন্য ভারাক্রান্ত হন। গভীরে ডুব দিলে এই কবিতায় কী দেখি, এখানে বৃক্ষটি হয়তো রাষ্ট্রের প্রতীক, দেশের জলছবি। ‘তোমার দেহকে অনাবৃত করে/নিয়ে যাই তোমার হৃদয় নিজেরই গূঢ় প্রয়োজনে’—দেশপাগল, স্বদেশ মায়ায় মাতাল ছাড়া এমন বাক্য কে লেখে? কবি বেলাল চৌধুরী এসব পরখ করার জন্যই হয়তো নির্বাসনে গিয়েছেন। একা একা চুপিচুপি এমন দৃশ্যগুলো দেখার জন্য নীরবে দৃষ্টি রেখেছেন নানান কোণ থেকে। আর চোখে যা ধরা পড়েছে, তা তুলে দিয়েছেন কবিতার ছত্রে। কবিতায় কি কিছু যায় আসে? যার যায় তার অনেক যায়, যার যায় না তার কিছুই যায় না। উপর্যুক্ত উক্তিতে এই যে দর্শন তা দেখতে গেলে একটি দেশকে, একটি রাজ্যকে, একটি জাতিকে দেখা যায়। কিন্তু কে দেখে সেসব? বেলাল চৌধুরীর মতো মানুষেরা, কবিরা তা দেখেন। দেখেন আর কাঁদেন, কাঁদেন আর কলমের খোঁচায় রেখে যান পৃথিবীর মলাটে। যদি কারো প্রয়োজন হয় কোনোদিন, সেদিন কেউ তাকাবে তার নিজের চুলের দিকে, বাঁকের দিকে। তাকাক আর না তাকাক মাটির প্রতি প্রেম, জলের প্রতি প্রেম, ধুলার প্রতি প্রেম, একটি পতাকার প্রতি প্রেম, তার ভেতর অনেকগুলো মানুষের প্রতি প্রেম যে কবিকে চিন্তিত করে রাখে, সে কবিকে একবাক্যে বলাই যায় স্বদেশের কবি। বেলাল চৌধুরীর আরো আরো কবিতার দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে, মাটি ও মানুষের গন্ধই পাওয়া যায়। প্রায় ঘরবন্দি এই মানুষটি শেষ বেলায় যেন এসব চিন্তাতেই আরো বিমর্ষ হয়ে ছিলেন। একা একা সেসব কথাই লিখতেন খাতায়, কবিতার আবহে। ভাবতেন দেশের কথা, দেশের মানুষের কথা। পৃথিবীর সামগ্রীক দুশ্চিন্তাও তাকে কম কুড়ে খেত না।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক
jobaiermilon88@yahoo.com

পিডিএসও/হেলাল