ভ্রমণ

যেখানে পাথর চিরদিন জেগে থাকে

প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৮, ১১:২২ | আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৮, ১১:৪৬

জাকির উসমান

জায়গাটার নাম মাইসছড়ি। খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলায় এর অবস্থান। জেলার জিরো পয়েন্ট থেকে মাইসছড়ির দূরত্ব প্রায় ১০-১১ কিলোমিটার। একটা বড় স্কুলমাঠ পেরিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটছে মাইসছড়ির নুনছড়ির উদ্দেশে। ডানপাশে স্কুলঘর। তার একপাশে বেঞ্চিপাতা গোটা কয়েক চায়ের দোকান। আয়েশ করে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন কয়েকজন পাহাড়ি। বাঁ পাশে পাঁচ-ছয়টি ছেলেমেয়ে মনের আনন্দে খেলছে। খুব বেলা হয়নি, তবুও এতক্ষণে রোদ তেতে উঠেছে। স্কুলমাঠ পেরোতেই ইটবিছানো একটা সড়কে এসে উঠলাম। সরু পথ। সকাল, তবুও ধুলো উড়িয়ে ছোটা গাড়ির সামনে তাকালে মনে হয় কুয়াশায় আচ্ছন্ন আবছা আলোর সন্ধ্যা। 

নুনছড়ি গ্রামের একটা ছোট ব্রিজের কাছে আমাদের গাড়ি থামল। সবাই নামলাম। ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে গেছে ঝিরি। বৃষ্টি না-হওয়ার এই সময়ে তবুও ঝিরির বুক চিরে তিরতির করে বয়ে চলেছে একটা ক্ষীণ স্রোতধারা। ছোট-বড় পাথরের পাশ কেটে বয়ে চলা এই পানি স্বচ্ছ। কলাগাছের একটা ঝোপের পাশ দিয়ে নেমে হাতমুখ ধুয়ে নিলাম। ঠাণ্ডা পানির আঁচ লেগে ক্লান্ত শরীর জেগে উঠল নিমেষেই।  

জায়গাটার নাম দেবতার পুকুরপাড়া। আমরা ট্রেকিংয়ে যাচ্ছি মাতাইতুয়ারি ট্রেইলে। দুজন গাইড ঠিক করা হলো; নাম দীপন ও রবিরাজ। তেরোশত সিঁড়ি পেরিয়ে ওপরে উঠলে যে পুকুরটি দেখা যাবে, সেটিই ‘দেবতার পুকুর’। আরণ্য জাতিগোষ্ঠীর কাছে পূজনীয় এই স্থান। প্রতি বছর উৎসবে তীর্থযাত্রীরা এখানে আসেন। পাহাড়ের খাঁজে মাটি কেটে তৈরি করা সিঁড়ি। কোথাও খাড়া পথ সোজা উঠে গেছে। কোথাও অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরে বাঁক নিয়ে পথ চলে গেছে উপরের দিকে। হাতের বাঁ-পাশেই পাহাড়ের কাটা শরীর ফুঁড়ে লাল মাটি বেরোনো। একহাত জায়গার ভেতর দৃষ্টিসীমা বাধা পাচ্ছে। পিঠে মাথা রেখে তাকালে পাহাড়ের ওপর দিকটা চোখে পড়ে। ডানপাশে ঠিক এর বিপরীত; অনেক দূর অব্দি ছোট-বড় নানারকম পাহাড় দেখা যায়। চৈত্রের খরতাপে গাছপালা মরে গেছে। পাহাড়গুলো কেমন ন্যাড়ামাথার গোপাল ভাঁড় হয়ে ব্যঙ্গ করছে আমাদের। অল্প সময়েই আমরা পৌঁছে গেলাম দেবতার পুকুরের বাঁধানো ঘাটে। প্রায় চতুর্ভুজাকৃতির পুকুর। লম্বালম্বি ঢুকে গেছে অন্যপাশের গাছগাছালির ভেতর। শ্যাওলা-রঙা পানি। ডানদিকের সিঁড়ি পেরোনো পাহাড়ের ওপর রঙ চকচকে শিবমন্দির। পুকুর এলাকার এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে একটা-দুটো দোকানঘর, বাড়ি আর গাছের ছায়ায় বেঞ্চিপাতা আসন। এখানকার লোকেরা প্রধানত ত্রিপুরা। খানিকক্ষণ কাটিয়ে আমরা ছুটলাম আমাদের গন্তব্য মাতাইতুয়ারির উদ্দেশে। 

শুরু হলো পুরোমাত্রার ট্রেকিং। আমরা আগে-পরে দুটো দলে ভাগ হয়ে নিলাম। মাথার ওপর কাঠফাটা রোদ। ছোট-খাটো পাহাড়গুলোর একপাশ দিয়ে উঠে আরেকপাশে নামছি। চৈত্রের পাতাঝরা পথ মাড়িয়ে কোথাও কোথাও গাছের ছায়ায় একটু-আধটু জিরিয়ে নিচ্ছি। হুটহাট বাতাস এসে শরীরে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। রোদের ভেতর এই বাতাস শরীরকে চাঙা করে তুলছে। কাছেই হাতের ডানদিকে পাহাড়ের পিঠে একটা ছোট্ট পাড়া চোখে পড়ল। দীপন বলল, এটির নাম স্কুলপাড়া। এই পাড়ায় একটা স্কুল আছে বলে এই নামে। দূর থেকেই দেখা গেল লাল রঙের ‘রিনাই’ পরা (ত্রিপুরা মেয়েদের কোমরের নিচের অংশের পোশাক) এক পাহাড়ি তরুণী নিচের ঝিরি থেকে পানি নিয়ে পাড়ায় ফিরছে। উজ্জ্বল ও সুন্দরী। চোখেমুখে রোদ লেগে গায়ের রঙে যেন রুপোর প্রলেপ পড়েছে। 


মাতাইতুয়ারির শেষ অংশটা নারীর উজ্জ্বল দুই পায়ের মতো, যে পায়ের স্তুতি করেছেন রবীন্দ্রনাথ।  একেবারে যেন দুই পায়ের সমান মাপ নিয়ে মাতাইতুয়ারি আছড়ে পড়ছে সামনের ঠাণ্ডা পানির খুমে। পার্থক্য কেবল এটুকুই—হয়তো নারীর কোল খুব উষ্ণ, কিন্তু মাতাইতুয়ারির কোল বড্ড শীতল!


একটা ঢালু পথ বেয়ে নামতেই আরেকটা পাহাড়। আবার ঢালু। আবার ওপরের দিকে উঠে যাওয়া খাড়া পথ। একটা জায়গায় জঙ্গল পার হচ্ছি। জায়গাটা ঘন গাছপালায় ছাওয়া। ছায়াময় ও শীতল। চৈত্রের দুপুরে এ যেন অবারিত এক প্রশান্তি। ক্লান্ত কণ্ঠে একটা-দুটো পাখিও ডেকে উঠল। ডানা ঝাপটে উড়ে গেল এ-ডাল থেকে ও-ডালে। হয়তো যেন এ-পাহাড় ছেড়ে ও-পাহাড়ে আত্মীয় বাড়িও গেল দু-একটা পাখি।

ঘড়িতে ১টার কাটা পেরিয়েছে। গাছের শেকড়ে আয়েশ করে বসেছি। ৮-১০টি ঘর নিয়ে ক্ষুদ্র একটি পাড়া। নামটিও ছোটদের নামের মতোই মিষ্টি—মালতিপাড়া। জুমচাষের ফসলে ভরে উঠেছে পাড়ার উঠোন। কাঁচা হলুদের মৌতাতে আমরাও উৎফুল্ল বোধ করছি। পাড়ার এক তরুণ উঠোন ভরা হলুদের স্তুপের পাশে নিবিষ্ট মনে কাজ করছেন। একপাশ থেকে সরিয়ে সদ্যতোলা হলুদে লেগে থাকা মাটি ছাড়িয়ে আরেকপাশে জমাচ্ছেন। আশপাশের ঘর থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে চেয়ে আছে কতগুলো উৎসুক চোখ। পাহাড়ি ছেলেপুলেরা খেলা রেখে কৌতূহল নিয়ে দেখছে আমাদের। 

এক-দেড় ঘণ্টার ভেতর আমরা ঝিরির দেখা পেয়ে গেলাম। শীত পেরোনো এই চৈত্রে যৌবনক্ষয়িষ্ণু ঝিরি। ক্ষীণ স্রোতের একটি ধারা বয়ে যাচ্ছে আপন খেয়ালে। হাতমুখ ভিজিয়ে খুব পরিতৃপ্তি পাওয়া গেল। চারপাশে ছড়ানো-ছেটানো অজস্র ছোট-বড় পাথর। ছায়াময় ঠাণ্ডা শীতল প্রাণজুড়ানো এমন একটা জায়গা পেয়ে সবাই পাথরে বসে, হেলান দিয়ে, শুয়ে একটা বড় সময় অলস আনন্দে কাটিয়ে দিলাম। কতভাবে ছবি তোলা হলো; পানিতে দাঁড়িয়ে-বসে, গাছের শেকড়ে হেলান দিয়ে-শুয়ে, গাছে উঠে, বিশেষ এক ধরনের বুনো লতায় ঝুলে—আরো কত ভঙ্গিমায়!

আরো অনেক পথ বাকি। গাইড তাড়া দিল। স্রোতের উৎসের দিকে ছুটলাম সবাই। অল্পক্ষণই হাঁটতে হলো। আপাতচোখে এখানে এসে পথ শেষ। এই মুহূর্তে সামনে দেখতে পাওয়া পাহাড় ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা এই ঝরনার নাম মাতাইতুয়ারি। যৌবন হারানো, দুর্বল-ক্লান্ত একটা স্রোত নিচে আছড়ে পড়ছে। ১৫-২০ হাত দূরে থাকতেই আমাদের থেমে যেতে হলো। ঝরনার একেবারে কাছটায় যেতে হলে এবার ভালোই পানিতে নামতে হবে। যারা সাঁতার জানে, তারা সাঁতরে চোখের পলকেই চলে গেল ঝরনার কাছে। বাকিরা কোমর আর গলা সমান পানিতে জলকেলিতে ব্যস্ত।

চৈত্রের খরতাপের উষ্ণ ও ভ্যাপসা দুপুর। পানিতে নেমেই শরীর কাঁপছে সবার। যেন বরফজমা পানি। যেনবা পেঁজাতুলোর মতো অদৃশ্য কুচি কুচি তুষারকণায় ভরা খুম। বেশিসময় থাকা গেল না। ভালোমতো তাকাতেই চোখে পড়ল, মাতাইতুয়ারি যেন সত্যিই এক রূপসী কন্যা। পাহাড় ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা শুরুর অংশটাই যেন কোনো সুন্দরীর সরু গলার মতো। তারপর খানিকটা বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রূপসী ললনার যেমন স্ফীত বক্ষ পেরিয়ে সরু কোমর; আশ্চর্য! মাতাইতুয়ারিরও যেন স্ফীত বুকের মতো একটি অংশ পেরিয়ে ঠিক মেয়েলি ঢঙে একটু বেঁকে সরু কোমর হয়ে নেমে গেছে নিচের দিকে। কোমরের পর নিতম্ব আর উরুর দুইপাশের পুরো জায়গা নিয়ে যেমন তুলনামূলক বিস্তৃত একটি অবয়ব থাকে নারীর, এখানেও তার কী নিখুঁত চিত্রকলা! মাতাইতুয়ারির শেষ অংশটা নারীর উজ্জ্বল দুই পায়ের মতো, যে পায়ের স্তুতি করেছেন রবীন্দ্রনাথ। একেবারে যেন দুই পায়ের সমান মাপ নিয়ে মাতাইতুয়ারি আছড়ে পড়ছে সামনের ঠাণ্ডা পানির খুমে। পার্থক্য কেবল এটুকুই—হয়তো নারীর কোল খুব উষ্ণ, কিন্তু মাতাইতুয়ারির কোল বড্ড শীতল! 

ঝরনার সামনের জায়গাটুকুতে বাঁশের ছোট ছোট মাচা বানানো। মাচায় নানারকম অঞ্জলি। পাড়জুড়ে ছড়িয়ে আছে অজস্র চাল-ডাল আর গমের দানা। পাহাড়িদের কাছে এই ঝরনা অত্যন্ত পূজনীয়। চাল-ডাল ও গমের এইসব দানা অর্ঘ্য হিসেবে পড়ে আছে ঝরনার পাশজুড়ে। আমরা আবার আগের পথে পেছনের দিকে এলাম। এবার ঝিরির স্রোতের দিকে ট্রেকিং শুরু হলো। ঝিরিটা এদিকটায় ক্রমশ, প্রায় চোখে পড়ে না ঠিক। এ রকম করে নিচের দিকে চলে গেছে। বাঁক পেরোতেই হাতের বাঁ দিকে ঢুকে গেছে আরেকটি অংশ। সোজা না গিয়ে বাঁ দিকের অংশটিতে ঢুকলাম আমরা। 

সৌন্দর্যের যে বিস্ময়ের জন্য আমাদের ট্রেকিং, সেই প্রতীক্ষা ফুরোতে ঘণ্টার বেশি দেরি হলো না। এখানে এসে ঝিরিটা প্রায় নব্বই ডিগ্রি কোণ সৃষ্টি করে আবারও বাঁ দিকে মোড় নিয়েছে। সবাইকে এখানে থামতে হলো। পানি যথেষ্ট গভীর। সেই গভীরতা বোঝার জন্য প্রথমে একজন নামলেন। শুরুর দিকেই দেখা গেল পানি বুক-সমান। এর মধ্যে আরো কজন নেমে পড়লেও একজনের চিৎকারে প্রথমেই বিপত্তি বাধল। পাশেই তাকিয়ে দেখা গেল, পাথরের ফাঁক গলিয়ে মাথা বের করে আছে জলজ্যান্ত একটি সাপ। ওপরে থাকা অন্যদের তাই নামতে দ্বিধাগ্রস্ত দেখা যাচ্ছে। একজন অভয় দিলেন, ‘আমরা আমাদের মতো চলে গেলে সাপ কারোরই কোনো ক্ষতি করবে না।’ হলো তা-ই, সাপের পাশ দিয়ে আমরা নিজেদের মতো করে চলে গেলাম। সাপ সাপের জায়গায়ই স্থির হয়ে রইল। সাপের এত কাছ দিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায়ও ছিল না। 

কোমর সমান পানি। পায়ের নিচের পাথরগুলো তুলনামূলক বড়। কারণ, পাথরে দাঁড়ালে পানি কোমর অব্দি, পায়ের নিচে থাকা পাথর থেকে পাথরে যেতে পানি বুক ছাড়িয়ে কখনো গলা সমান। একটু খাটো কারো কারো চিবুক আর ঠোঁট ছুঁইছুঁই করছে পানি। আকাশে জ্বলজ্বলে সূর্য থাকলেও ঘন গাছপালায় ছাওয়া জায়গাটা আবছা অন্ধকার। সত্যিই গা ছমছম করছে। দুইপাশের পাহাড় ক্রমশ সরু হতে হতে জায়গাটা একটা ঘুপচি গলির মতো হয়ে আছে। যেন কোনো প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা। সারি সারি প্রাচীন ভবনের পাশ দিয়ে সুরঙ্গ পথে ঢুকে যাওয়ার গোপন রাস্তা ধরে যেন চলেছি আমরা। অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধে অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম সবাই।  পাহাড়ের ওপাশে সূর্য ডোবার আয়োজন শুরু হয়েছে। আমরা একটি লোকালয়ের কাছে পৌঁছালাম। দীপন বলল, এই পাড়ার নাম তামৈতাপাড়া। এতক্ষণ যে ঝিরি পেরিয়ে এলাম, এর নামও পাড়ার নামেই ‘তামৈতা ঝিরি’। ট্রেকাররা এই ঝিরিটিকেই হতংকুচো ও মাতাইতুয়ারি ঝিরি নামে ডেকে থাকেন। হতংকুচো মূলত এখানকার একটি পাহাড়ের নাম। যেটি ঝিরি থেকে তামৈতাপাড়ায় ঢুকতে হাতের ডানদিকে পড়ে; আশপাশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় সম্ভবত এই হতংকুচোই। 

পার্বত্যাঞ্চলে গেলে—পাহাড়ে, পাড়ায়, ঝিরিতে, পথের বাঁকে বাঁকে, জঙ্গল ও অরণ্যের স্থানে স্থানে নানান আকারের পাথর দেখা যায়। এইসব দেখে সৈয়দ আলী আহসানের ‘দেশের জন্য’ কবিতাটি মনে পড়ে—কখনও আকাশ যেখানে অনেক হাসিখুশি ভরা তারা,/কখনও সাগর যেখানে স্রোতের তরঙ্গ দিশাহারা।/কখনও পাহাড় যেখানে পাথর চিরদিন জেগে থাকে,/কখনোবা মাঠ যেখানে ফসল সবুজের ঢেউ আঁকে। হতংকুচোর ঘন অরণ্য, মাতাইতুয়ারি আর তামৈতার বুনো সৌন্দর্য—মুগ্ধবিস্ময়ের এমন সব ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে; সত্যিই ‘যেখানে পাথর চিরদিন জেগে থাকে’। কৌতূহলী মানুষের সৌন্দর্যসুধার অবারিত আধার নিয়ে এইখানে পাথর জেগে থাকুক অনন্তকাল। 

পিডিএসও/হেলাল